ইতিহাস

সাম্রাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি : হিরোশিমা নাগাসাকিতে রক্তাক্ত ট্রাজেডী

উদযাপিত হ’ল হিরোশিমা-নাগাসাকির ৭০ তম বার্ষিকী। ৭০ বছর পর পৃথিবীবাসী স্মরণ করছে জাপানের দু’টি শহরের বীভৎস চেহারা ও বিভীষিকাময় দুঃখজনক স্মৃতি। প্রায় পৌনে এক শতাব্দী পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের নৃশংতায় জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকির শহর দু’টি ধ্বংসসত্মূপে পরিণত হয়। কয়েক লক্ষ অসহায় বনী আদম মৃত্যু মুখে পতিত হয়। মানব বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় তথাকথিত মানব সভ্যতার পাদপীঠ জাপান। এর জন্য মারণাস্ত্রই মূলতঃ দায়ী। সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব, হিংস্র মানসিকতা, কুচক্রী ইহূদী বিজ্ঞানীর উৎসাহী ভাবনা এবং আইনস্টাইনের কুপরামর্শে তৈরী হয় মারণাস্ত্র। পারমানবিক অস্ত্র প্রথম পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। নির্বিকার দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন আবিষ্কারকরা, কেউ ছিল স্তব্ধ-বাকশূন্য, কেউ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে চোখের পানি ফেলেছিলেন। কেউবা আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলেন। তারপরেও শুধুমাত্র আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির অজুহাতে আমেরিকা ইতিহাসের এক বর্বরোচিত ও জঘন্য হামলা পরিচালনা করে। আজও তার স্মৃতি বহন করছে হিরোশিমা ও নাগাসাকিবাসী। এই অধিবাসীর মায়েরা সর্বদা আতঙ্কে দিনাতিপাত করে তার শিশু সন্তান সুস্থভাবে জন্ম নিবে কি-না। কিংবা তারা এই পৃথিবীতে বেশীদিন টিকবে কি-না? কারণ পারমানবিক তেজস্ক্রিয়া এত তীক্ষন ও ভয়াবহ যে, মানব দেহকে বিকলাঙ্গ ও পঙ্গু করে দেয়। এমনকি মরণব্যাধি ক্যান্সারেও পরিণত হয়। ৭০ বছর ধরে জাপানীরা সহ সারা বিশ্ব আকুল আবেদন করছে ‘পারমানবিক বোমা মুক্ত’ বিশ্ব গড়ার। কিন্তু এই বঞ্চিত মানবতার বুকফাটা করুণ আর্তনাদ শ্রবণ করার কেউ নেই। সবাই ব্যস্ত নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে। নিজের ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যবাদী চেতনা অব্যাহত রাখতে। ফলে বিশ্ব এখন মারণাস্ত্র মুক্ত হওয়ার পরিবর্তে সর্বাধিক মারণাস্ত্রের ভা-ারে পরিণত হয়েছে। ফলে ‘সণায়ু যুদ্ধ’ বা (ঈড়ষফ ধিৎ) নামের বিশ্ব যুদ্ধের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তাই অকপটচিত্তে স্পষ্ট ভাষায় বলা যায় যে, বর্তমানে বিজ্ঞানের এই যুগে পৃথিবীবাসী নিজেদের ধ্বংসের মারণাস্ত্রই অর্জন করেছে মাত্র, নৈতিক ও বুদ্ধিভিত্তিক সক্ষমতা অর্জন করেনি।

জাপানের পারমানবিক বোমার প্রেক্ষাপট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ :

১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ই আগস্ট মানবতা হত্যা ও ধ্বংসের পিছনে যে প্রেক্ষাপট কাজ করে, তাহ’ল সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব। জার্মানীর একনায়ক হিটলারের বিশ্বশাসনের অমূলক, অবাস্তব ও অসম্ভব খায়েশ দিয়ে শুরু এবং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতালিপ্সার জন্যই হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংসসত্মূপে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয় হিটলারের ন্যাৎসী বাহিনীর পোলা- আক্রমণের মধ্য দিয়ে। ১৯৩৯ সালের পহেলা সেপ্টেম্বরে জার্মানী পোলা- আক্রমণ করে। প্রতিউত্তরে মিত্রবাহিনী জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ৩রা সেপ্টম্বর। অবশেষে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মানবতার লজ্জার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ সমাপ্ত করে। এ যুদ্ধে পৃথিবীর পরাশক্তিগুলো এবং অন্যান্য ছোট-বড় রাষ্ট্রগুলো দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে জার্মান নেতৃত্বে ‘অক্ষশক্তি’ এবং অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে ‘মিত্রশক্তি’।

অক্ষশক্তির প্রধান তিনটি রাষ্ট্র হ’ল জার্মান, ইতালী ও জাপান। মিত্রশক্তির প্রধান রাষ্ট্রগুলো হ’ল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও পোলা-। আমেরিকা প্রথমে মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়নি। কিন্তু ১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর জাপান সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে এবং আকস্মিকভাবে পার্ল হারবার আক্রমণ করে। পার্ল হারবারে ছিল আমেরিকার নৌ ও বিমান ঘাটি। এ আক্রমণে ২৪০২ জন আমেরিকান নিহত হয় এবং ১২৮২ জন আহত হয়। যার ফলে ১৯৪১ সালে ৮ই ডিসেম্বর আমেরিকা মিত্র শক্তিতে যোগ দেয় এবং জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১১ ডিসেম্বর জার্মানী ও ইতালী আমেরকিার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অক্ষশক্তিকে থামানোর জন্য প্রয়োজন ছিল একটি মারণাস্ত্র আবিষ্কারের। আমেরিকা সেই মারণাস্ত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার মধ্যেই অক্ষ শক্তিগুলোর পরাজয় সুনিশ্চিত এবং আত্মসমর্পণ করে অনেকেই। এমতাবস্থায় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমানবিক হামলা চালিয়ে আমেরিকা তার নিজস্ব সর্বোচ্চ সামরিক ক্ষমতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বে অন্যতম প্রধান সামরিক সুপার পাওয়ার রাষ্ট্র হিসাবে। মিত্রশক্তি হিসাবে সোভিয়েত রেড আর্মী ও চীনারা যে দখলদারিত্ব শুরু করেছিল, পারমানবিক হামলার মাধ্যমে তাদের দখলদারিত্বের রথযাত্রা থামাতে বাধ্য হয়। অক্ষশক্তি ও মিত্রশক্তিগুলো আমেরিকার একনায়কতান্ত্রিক ও একচেটিয়া আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পারমানবিক প্রযুক্তি অর্জনে ব্যাপক আকারে বিনিয়োগ করে এবং পারমানবিক সক্ষমতা অর্জন করে। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ব আবার প্রবেশ করে সণায়ু যুদ্ধ (ঈড়ষফ ধিৎ) নামক নতুন এক যুগে। বিগত তিন শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা ১৯৩৯ সালে হ’তে ১৯৪৫ সাল পর্যমত্ম প্রায় দীর্ঘ ছয় বছর স্থায়ী ছিল এবং এ যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১ কোটি মানুষ নিহত হয়। আহত হয় প্রায় ৩ কোটি, যার ৮০% ছিল সাধারণ নিরীহ মানুষ।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি :

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকি নগরীতে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম পারমানবিক বোমা নিক্ষক্ষপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৫ শতকে হিরোশিমা ছিল একটি জরাজীর্ণ গ্রাম। ১৬ শতকে মরিক্লান হিরোশিমায় একটি মন্দির নির্মাণের মাধ্যমে উন্নয়নের বীজ বপন করেন। তখন থেকেই মূলতঃ হিরোশিমা শহরটি ছিল জাপানের চুগকু-শিককু যেলার সবচেয়ে বড় মন্দিরের শহর। দীর্ঘকাল ধরে গড়ে উঠা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধ হিরোশিমা বোমার আঘাতে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। ধ্বংসসত্মূপ হিসাবে পৃথিবীর সর্বত্র হিরোশিমা পরিচিতি লাভ করে।

জাপানের রাজধানী টোকিওর দক্ষক্ষণ-পশ্চিমে ৬শ’ ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে হিরোশিমা শহরের অবস্থান। বর্তমানে এই শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ১.৮৮ মিলিয়ন। অটোমোবাইল, ইস্পাত, প্রকৌশল, জাহাজ মেরামত, খাবার প্রক্রিয়াকরণ ও আসবাবপত্র শিল্পে শহরটি এখন বিশ্বের দরবারে যথেষ্ট সমাদৃত। বলা হয়ে থাকে, হিরোশিমা উপসাগর ঝিনুকের অাঁধার হিসাবে বিখ্যাত আর সণানের ক্ষক্ষত্র হিসাবে জাপানি সংস্কৃতির ধারক। আনুমানিক ৩শ’ বছরেরও অধিককাল আগ থেকে জাপানে উৎপাদিত ঝিনুকের সিংহভাগ উৎসই এই হিরোশিমা উপসাগর। নাগাসাকি জাপানের একটি উন্নত শহর। ১৬ শতকে পর্তুগিজ নাবিকরা জাপানী মৎস্যজীবী অধ্যুষিত এই দ্বীপে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন ঘটায়। ১৫৪৩ সালে নাগাসাকি দ্বীপটিতে প্রথম ইউরোপীয় হিসাবে পর্তুগিজদের পা পড়ে। ১৮৫৯ সালে নাগাসাকিকে উন্মুক্ত বন্দর হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বন্দর নগরী নাগাসাকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসাবে পরিণত হয়। কারণ এই দ্বিপটিতেই জাপানের রাজকীয় নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ নির্মাণ কারখানা ছিল।

আরও দেখুন:  রাসূল (ছাঃ) -এর মৃত্যু: এক হৃদয় বিদারক ঘটনা

হিরোশিমা ও নাগাসাকির বীভৎস চেহারা ও বিভীষিকাময় দৃশ্য :

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট স্থানীয় সকাল ৮ টা ১৬ মিনিটে হিরোশিমার মাটি থেকে প্রায় ২ হাযার ফুট উপর থাকা অবস্থায় ‘লিটল বয়’ নামক বোমাটি বিস্ফোরিত করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে গতি, তাপ, আলো প্রভৃতি ধরনের শক্তিতে রুপামত্মরিত হয়ে অভাবনীয় এক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। বিশাল ব্যাঙ্গের ছাতার মতো কু-লী হিরোশিমার আকাশকে ছেয়ে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে তা শহরের ৯০ শতাংশ মাটির সাথে মিশে যায়। নিমিষেই করুণ মৃত্যু হয় ৭৫ হাযার মানুষের। ডিসেম্বরের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৬৬ হাযার। তিনদিন পর নাগাসাকিতে বোমা বিস্ফোরণের সাথে সাথে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাযার। গুরুতর আহত হয় ৭৫ হাযার মানুষ। বোমার তেজস্ক্রিয়ার বিকিরণের ফলে ২ লক্ষ ৩০ হাযার মানুষের মৃত্যু ঘটে। মানব দেহ সহ সবকিছু মুহূর্তে সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায়। ভূ-পৃষ্ঠের পাথুরে বা কংক্রিটে কেবল মানব-মানবীর দেহ অবয়বের অস্পষ্ট ছায়াচিহ্ন পরিদৃষ্ট হয়। ঘর-বাড়ী, গাছ-পালা, পশু-পাখি থেকে শুরু করে জীববৈচিত্রের প্রায় সবকিছু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়। এখনো এই দুই শহরের এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নবজাতকরা এই নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার মূল্য দিয়ে চলেছে। ভয়াবহ হামলার স্মারক বয়ে চলেছে এই এলাকার মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

সত্তর বছর আগের বিভীষিকা ও বীভৎসতার কথা তখনকার মানুষরাতো বটেই, বর্তমান যুগের মানুষরা এমনকি ভবিষ্যতের মানুষেরা ভুলতে পারবে না। প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে তেমনি একজন বলেছেন সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা। ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘প্রথমে মনে হ’ল আকাশ থেকে যেন একটা কালো প্যারাসুট নেমে আসছে। পরমুহূর্তেই আকাশ যেন জ্বলে উঠল। আলোর সেই ঝিলিক যে কি রকম তা বলার সাধ্য কারো নেই। সেই সঙ্গে প্রচ- শব্দ। বিস্ফোরণের পরমুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলো শত শত ভবন ও হাযার হাযার মানুষ। সেই সঙ্গে আশপাশের জিনিস-পত্র এদিক-ওদিক পড়ে জমা হ’তে থাকল। চারিদিকে আলো ও অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। হামাগুড়ি দিয়ে বের হ’তে হ’ল। বাতাসে উৎকট গন্ধ। মানুষের মুখের চামড়া যেন ঝুলে পড়েছে। কনু্ই থেকে আঙ্গুল অবধি হাতের চামড়া ঝুলে পড়েছে। কাতরাতে কাতরাতে ঝর্ণা ও নদীর দিকে ছুটে চলছে অসংখ্য মানুষ। সারা দেহে অসহ্য যন্ত্রণা। চারিদিকে অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ পড়ে আছে। নদীর তীরের কাছে একজন নারী আকাশের দিকে মুখ করে পড়ে আছে। বুকদু’টা তার উপড়ানো, সেখান থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। ঘণ্টা দুয়েক পর আকাশ একটু ফিকে হয়ে গেল। ঝলসে যাওয়া হাত দু’টি থেকেও হলুদ কষ পড়ছে। স্কুলের ছেলে-মেয়েরা কাতরাচ্ছে আর চিৎকার দিয়ে কাঁদছে, মাগো! মাগো! বলে। ভয়ংকরভাবে পুড়ে গেছে তারা। সারা শরীরে রক্ত গড়াচ্ছে। একে একে দেহগুলো নিথর হয়ে যাচ্ছে’।

অষ্ট্রেলিয়ার সাংবাদিক উইলফ্রেড গ্রাহাম বুর্চেট ঘটনার চার সপ্তাহ পর হিরোশিমায় পৌঁছে পত্রিকার জন্য একটি নিউজ তৈরী করেন। তিনি লিখেছেন, ‘ত্রিশতম দিনে হিরোশিমা থেকে যারা পালাতে পেরেছিলেন তারা মরতে শুরু করেছেন। চিকিৎসকরা কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছেন। বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়ার ভয়ে মুখোশ পরে আছেন সকলেই’। তিনি আরো লিখেছেন, ‘হিরোশিমাকে বোমার বিধ্বস্ত শহর বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, দৈত্যাকৃতির একটি রোলার যেন শহরটিকে পিষে দিয়ে গেছে’। বোমায় অক্ষত থাকা মানুষগুলো দিন কয়েকপর অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে ও হাসপাতালে যেতে থাকে। চিকিৎসকরা তাদের শরীরে ভিটামিন-এ ইনজেকশন দেয়। দেখা যায় যে, ইনজেকশনের জায়গায় গোশত পচতে শুরু করেছে। এমন মানুষদের একজনও বাঁচেনি। ৫ সেপ্টেম্বর বুর্চেটের ডেসপ্যাচটি (নিউজ) ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় ছাপা হয়। দুর্ভাগ্য হ’ল, সাহসী সাংবাদিক নিজেই তেজস্ক্রিয়ার বিকিরণে আক্রামত্ম হয়ে ১৯৮৩ সালে ক্যান্সারে মারা যান। সে বছরই তার লেখা ‘শ্যাডো অফ হিরোশিমা’ বইটি প্রকাশিত হয়।

পারমানবিক তেজস্ক্রিয়ার ক্ষয়ক্ষতি ও মানবদেহে তার প্রভাব :

পারমানবিক তেজস্ক্রিয়তার ফলে আহত হওয়া এবং পঙ্গু হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যু এর শেষ পরিণতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অব হেলথ’-এর তথ্য মতে, কোন মানুষ যদি ১ হাযার মিলিসিভার্ট পর্যমত্ম রেডিয়েশনের শিকার হয়, তাহ’লে তাকে তেজস্ক্রিয়াজনিত অসুস্থ বলা যাবে। আর যদি ৪ হাযার মিলিসিভার্ট পর্যমত্ম রেডিয়েশনের শিকার হয়, তাহ’লে বেশিরভাগ মানুষ মারা যাবে। আর ৬ হাযার মিলিসিভার্ট রেডিয়েশন হলে মানুষের বাঁচার কোন সম্ভাবনা নেই। কোন রেডিয়েশনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদীও হ’তে পারে। রেডিয়েশনের অজ্ঞান ব্যক্তির দেহে রাসায়নিক পরিবর্তন হবে। তার দেহের কোষ ধ্বংস হবে। ফলে রক্তক্ষরণ, মাথার চুলপড়ে যাওয়া, চামড়া কুঁচকে যাওয়া, ঘা হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেবে। পারমানবিক তেজস্ক্রিয়ার ফলে অনেকের মাঝে ছিল ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বিশাল ছিল যে, বিস্ফোরণ সংঘটনের প্রায় ১০ মাইল দূরের মানুষদেরও শরীরের চামড়া খসে পড়েছিল। বোমা হামলার সময়ই কেবল নয়, তেজস্ক্রিয়ায় কয়েক লাখ মানুষের মৃতু হয়েছে। তেজস্ক্রিয়া, পোড়া ও ক্ষতের কারণে ১৯৪৫ সালের শেষে কেবল হিরোশিমাতেই নিহত হয়েছে ৬০ হাযার মানুষ। পাঁচ বছর পর নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লক্ষ ৩০ হাযার।

মরণযজ্ঞের নেপথ্যে কারণ :

ইতিহাসে এটিই ছিল সময়ের একক হিসাবে বড় গনহত্যা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সময়ে এই মরণযজ্ঞের নেপথ্যের কারণ নিয়ে বিশেস্নষকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হ’ল, এটি কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বশেষ পদক্ষক্ষপ ছিল, না-কি তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ঠা-া যুদ্ধ সূচনার প্রথম পদক্ষক্ষপ ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্নটি অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হ’তে আজ অবধি বিশ্ববাসী যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব অবলোকন করছে। তারা আজ অবাধ্য। তাদের নিকট পৃথিবীবাসী আজ অবনত। মানবতা আজ অবদমিত। ৬ই আগস্ট হিরোশিমায় বোমা ফেলা হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের জিজ্ঞাসা, মানব বিধ্বংসী নতুন অস্ত্র পারমানবিক বোমা ব্যবহারের আদৌ কী কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল? এই মরণযজ্ঞের ব্যবহার আদৌ ছিল না। কেননা বোমাবর্ষণের আগের ঘটনাবলীর দিকে দৃষ্টি দিলে আমাদের নিকট তা পরিস্ফুটিত হয়ে উঠে। ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ের শেষদিকে টোকিও শহরের উপর বিধ্বংসী বোমাবর্ষণ করে আমেরিকা। জাপানের সামরিক শক্তি প্রায় সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে গেছে। ১৯৪৫ সালের ৮ই মে বার্লিন মুক্ত হওয়ার পর জার্মানীর ন্যাৎসি বাহিনী পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমার্পণ করেছে। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট ইতালী শেষ, ইউরোপে যুদ্ধ শেষ, জাপানের সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য ২৬ আগস্ট পর্যমত্ম সময় বেঁধে আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। জাপান আত্মসমর্পণ করার কথা ভাবতে শুরু করেছিল। তাহ’লে পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণ বা মরণযজ্ঞের নেপথ্যে কারণ কী? আদৌ কি এর কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল? মূলতঃ বোমা নিক্ষক্ষপের প্রয়োজনীয়তা ছিল অন্যত্র। কিন্তু কি সে প্রয়োজনীয়তা, কি সে কারণ, যে কারণে মানবতাকে হত্যা করার মারণাস্ত্র আমেরিকা ব্যবহার করেছিল? বিশেস্নষকগণ কয়েকটি উদ্দ্যেশের কথা বলেছেন। যেমন- প্রথমতঃ ইয়ালটা চুক্তি অনুসারে ইউরোপে যুদ্ধ শেষের পর ‘সোভিয়েত রেড আর্মি’ যেন এশিয়ার যুদ্ধে প্রবেশ করতে না পারে তার বন্দোবস্ত করা। রেড আর্মি জাপানে আক্রমণ করার পূর্বেই আমেরিকার কমিউনিজমের নিকট একতরফা জাপানি আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা। এশিয়াকে কমিউনিজমের প্রভাব হ’তে মুক্ত রাখা। কমিউনিজম বিরোধী মার্কিন এই ক্রসেডের স্বার্থে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ জাপানী বেসামরিক নাগরিককে নিমিষে বলি দিতে মার্কিনীরা কুণ্ঠিত হয়নি।

আরও দেখুন:  খলীফা হারূনুর রশীদের নিকটে প্রেরিত ইমাম মালেক (রহঃ)-এর ঐতিহাসিক চিঠি (১)

দ্বিতীয়তঃ ২৫০ কোটি ডলার খরচ করে ইতিহাসের যে ভয়ঙ্কর অস্ত্র তৈরি হ’ল, রণক্ষক্ষত্র তার কার্যকারিতা কতটুকু সেটা যাচাই করে দেখার ইচ্ছা ছিল মার্কিনীদের (বিবেকানান্দ মুখোপাধ্যায়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ইতিহাস)।

তৃতীয়তঃ রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদীরা পৃথিবীবাসীকে অবনত করতে চেয়েছিল। অপর পরাশক্তিকে (সোভিয়েত ও বিশ্বের অন্যান্য দেশকে) ভয় দেখিয়ে বস্ন্যাকমেইল করা। কিন্তু সে পরিকল্পনা বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কারণ সোভিয়েত ১৯৪৯ সালের ২৯ শে আগস্ট প্রথম পারমানবিক বোমার পরীক্ষা করেছিল। ২২ হাযার টন ডিনামাইটের শক্তিশালি পস্নুটোনিয়াম বোমার বিস্ফোরণের ফলে আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য থেমে যায়। কিন্তু মানব ইতিহাসে যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।

মানহাট্রন প্রজেক্ট ও পারমানবিক বোমার জন্ম :

পারমানবিক অস্ত্র এমন এক ধরনের যন্ত্র, যা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার ফলে প্রাপ্ত প্রচ- শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে। সে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া ফিসানের ফলে অথবা ফিসার ও ফিউশান উভয়েরই সংমিশ্রণেও সংগঠিত হ’তে পারে। উভয় বিক্রিয়ার কারণেই খুবই অল্প পরিমাণ পদার্থ থেকে শিল পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। আধুনিক এক হাযার কিলোগ্রামের একটি থার্মো-নিউক্লিয়ার অস্ত্রের বিস্ফোরণ ক্ষমতা প্রচারিত প্রায় ১ বিলিয়ন কিলোগ্রামের প্রচ- বিস্ফোরক দ্রব্যের চেয়েও বেশী। পারমানবিক অস্ত্রকে ধরা হয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের এক বোমা হিসাবে। যুদ্ধের ইতিহাসে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় মাত্র দু’টি পারমানবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। ‘লিটল বয়’ হিরোশিমাতে এবং ‘ফ্যাট ম্যান’ নাগাসাকিতে। ‘লিটল বয়’ বা বামন বোমা এবং ফ্যাটম্যান বা স্থুলকায় বোমার এ ফলাফল ছিল ভয়াবহ। এছাড়া আরো প্রায় ২০০০ বার পরীক্ষামূলকভাবে এবং প্রদর্শনের জন্য এ বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। বর্তমানে পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং মওজুদ আছে এমন দেশগুলো হ’ল যথাক্রমে- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন, ভারত ও পাকিস্তান। এছাড়া এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, উত্তর কোরিয়া, ইসরাঈলেও পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি)’-এ বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে এখনো ৫ হাযারের বেশী পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে। এসবের মধ্যে ২ হাযার অস্ত্র সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। রিপোর্টে আরো বলা হয়, ব্রিটেন, চীন, ফ্রান্স, ভারত, ইসরাঈল, পাকিস্তান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ২০ হাযার ৫০০ এর বেশী যুদ্ধবোমার মালিক।

পারমানবিক বোমার পরিচয় :

লিটল বয় :

(ক) তেজস্ক্রিয় পরমাণু : ইউরেনিয়াম-২৩৫ (খ) ওযন : চার হাযার কেজি (গ) দৈর্ঘ্য : ৯.৮৪ ফুট (ঘ) পরিধি : ২৮ ইঞ্চি (ঙ) মূল আঘাত : শিমা সার্জিক্যাল ক্লিনিক (চ) বিস্ফোরণের মাত্রা : ১৩ কিলোটন টিএনটির সমান (ছ) বহনকারী বিমানের নাম : বি ২৯ সুপার ফোর্টেস (জ) পাইলটের নাম : কর্নেল পল টিবেটস (ঝ) বোমা পতনের সময় : ৫৭ সেকেন্ড।

ফ্যাটম্যান :

(ক) তেজস্ক্রিয় পরমাণু : পস্নুটোনিয়াম-২৩৯ (খ) ওযন : চার হাযার ছয়শত ত্রিশ কেজি (গ) দৈর্ঘ্য : ১০.৬ ফুট (ঘ) পরিধি : ৪ ইঞ্চি (ঙ) মূল আঘাত : মিতসাবিসি স্টিল, অস্ত্র কারখানা ও সমরাস্ত্র কারখানার মাঝামাঝি (চ) বিস্ফোরণের মাত্রা : ২১ কিলোটন টিএনটির সমান (ছ) বহনকারী বিমানের নাম : বি ২৯ বস্কার (জ) পাইলটের নাম : মেজর চার্লস ডবলু সুইনি (ঝ) বোমা পতনের সময় : ৪৩ সেকেন্ড।

সুধী পাঠক! জাপানের দু’টি প্রসিদ্ধ শহরে বিশ্বযুদ্ধের সময় মাত্র দু’টি পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতগুলো বছরের পরেও এখনও পরমাণু বোমার সেই বিভীষিকা থেকে মুক্ত হ’তে পারেনি জাপানের জনগণ। পারমানবিক বোমার তেজস্ক্রিয়ার ফলে এখনও অনেক শিশু বিকলাঙ্গ কিংবা শারীরিকভাবে ত্রুটিযুক্ত হয়ে জন্ম গ্রহণ করে। মাত্র দু’টি বোমায় যদি এই অবস্থা হয়, তাহ’লে পৃথিবীবাসীর নিকট রক্ষিত মোট ১৬ হাযার বোমা বিস্ফোরণ হ’লে কি অবস্থা হবে তা পরিকল্পনার বাইরে।

পারমানবিক বোমার পরিমাণ :

পরমাণু বিজ্ঞানীদের দেওয়া বুলেটিন থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে এখন মোট ১৬ হাযার ৩০০টি পারমানবিক বোমা মওজুদ রয়েছে। কিন্তু ‘ফেডারেশন অব আমেরিকান’ বিজ্ঞানীদের মতে এই বোমার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাযার ৬৫০টি। ১৪ টি দেশে ৯৮ টি স্থানে এই বোমা মওজুদ করে রাখা হয়েছে। এছাড়াও ৮০০ পারমানবিক বোমা সম্পূর্ণ সক্রিয় অবস্থায় রাখা হয়েছে। যাতে মাত্র কয়েক মিনিটের নোটিশে সেগুলো শত্রুপক্ষের উপর নিক্ষেপ করা যায়। তবে সম্প্রতি আরেকটি বুলেটিনে জানানো হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিকট ৭১০০টি, রাশিয়ার ৮০০০ টি, যুক্তরাজ্যের ২১৫ টি, ফ্রান্সের ৩০০টি, চীনের ২৫০টি, ইসরাঈলের ৮০টি, পাকিস্তানের ১০০-১২০টি ভারতের ৯০-১১০টি এবং উত্তর কোরিয়ার নিকট ১০টি পারমানবিক বোমা রয়েছে।

আরও দেখুন:  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মুসলিম চেতনা

পারমানবিক বোমার উৎপত্তির ইতিহাস :

দুই হাযার বছর আগে গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস পরমাণুর ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন। Atom ইংরেজী শব্দ, যার প্রতিশব্দ পরমাণু। অর্থ যাকে আর ভাগ করা যায় না। ডেমোক্রিটাসের মতে, ‘পৃথিবীতে একমাত্র বিদ্যমান পদার্থ হ’ল পরমাণু’। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে আইনস্টাইন মানুষের চিন্তা জগতে কয়েকটি বৈপ্লবিক ধারণার সৃষ্টি করেছিলেন। এই ধারণাগুলোর মধ্যে ‘ভর ও শক্তির বিনিময়তা’ ছিল অন্যতম। তার সেই বিখ্যাত সমীকরণটি হ’ল E=mc2। এখানে E দ্বারা শক্তি, m দ্বারা ভর এবং c দ্বারা প্রতি সেকেন্ডে আলোর বেগকে বুঝানো হয়েছে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে আলবার্ট আইনস্টাইন এক নতুন থিওরি আবিষ্কার করেন, যা অবিষ্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ তার বিখ্যাত সমীকরণটির মাধ্যমে পারমানবিক বোমা আবিষ্কারের পথ উন্মুক্ত হয়। পারমানবিক বোমা আবিষ্কারের পিছনে মূলতঃ তথ্য সন্ত্রাস, কিছু ইহুদী কুচক্রী বিজ্ঞানীদের উৎসাহী মনোভাব, আইনস্টাইনের কুপরামর্শ ও পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব অনেকাংশে দায়ী। তাছাড়া মানব বিধ্বংসী অস্ত্র সৃষ্টির পিছনে যাদের অবদান তাদেরকে কুচক্রী বিজ্ঞানী বা তাদের পরামর্শকে কুপরামর্শ বললে অনেকেরই হৃদয়ে কাঁটা বিঁধে। কিন্তু যা বাস্তব তা বলতে বাধা কোথায়!

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগেই ফরাসী বিজ্ঞানীরা পারমানবিক বোমা ও শক্তি উৎপাদনের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে হিটলার ঘোষণা করল যে, জার্মানির হাতে এমন এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র আছে, যার গতিরোধ বা ধ্বংস করার কৌশল কারো জানা নেই।

অতঃপর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বিজ্ঞানী ছাদউইককে হিটলারের গোপন অস্ত্রের শক্তির উৎস অনুসন্ধান করার অনুরোধ করেন। ছাদউইক তার প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সরকারকে জানিয়েছিলেন যে, ১ থেকে ৩০ টিন ইউরিনিয়াম যোগাড় করতে পারলে এই ধরণের বোমা তৈরী করা সম্ভব। কিন্তু অটো ফ্রিস ও রুডলফ বিজ্ঞানীদ্বয় হিসাব করে দেখলেন যে, প্রাকৃতিক ইউরোনিয়ামের পরিবর্তে যদি খাঁটি ইউরোনিয়াম ২৩৫ মৌল ব্যবহার করা হয়, তাহ’লে ১ থেকে ৩০ টন ইউরোনিয়ামের দরকার নেই, বরং কয়েক পাউন্ড ইউরোনিয়াম হলেই বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। ব্রিটিশ সরকার ছাদউইককে বোমা তৈরীর দায়িত্ব দিলেন। যে সকল ইহুদী বিজ্ঞানীরা হিটলারের ক্ষমতা দলের সাথে সাথে জার্মান ত্যাগ করেছিলেন, সেই দেশত্যাগী বিজ্ঞানীরাই ব্রিটিশ ও যুক্তরাষ্ট্রকে পারমানবিক বোমা তৈরীর সম্ভাব্যতার কথা বুঝিয়েছিলেন। ফলে ব্রিটিশ সরকার বিজ্ঞানীদের নিয়ে ‘থমসন কমিটি’ গঠন করে। এই ‘থমসন কমিটি’ই পরে মড কমিটিতে রূপ নেয়। অপর দুই বাস্ত্তহারা বিজ্ঞানী ঝিলার্ড ও এডওয়ার্ড টেলর যুক্তরাষ্ট্রকে পারমানবিক বোমা তৈরীর ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। আইনস্টাইন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্টকে কয়েকটি চিঠি লিখে এ ব্যাপারে বুঝিয়ে বলেন। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিগস কমিটি গঠন করে। ফলে পারমানবিক বোমা তৈরীর কলাকৌশল বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আদান-প্রদান শুরু হয়।

পারমানবিক শক্তি বা অস্ত্র তৈরীতে একটি মহার্ঘ উপাদান হ’ল ভারী পানি। ১৯৪০ সালের প্রথম দিকে একমাত্র নরওয়ের রুকানে শিল্প মাত্রায় ভারী পানি তৈরী হচ্ছিল। অতঃপর নরওয়ের এই ভারী পানির দিকে নযর দেয় জার্মানি। কিন্তু ফরাসী যুবক আলিয়ার বুদ্ধি ও কুশলতায় তা করায়ত্ত করে ফ্রান্স। ১৮৫ কিলোগ্রাম ভারী পানি ফরাসীদের হস্তগত হয়। ১৯৪০ সালের ১০ মে জার্মানী ফ্রান্স আক্রমণ করে। জার্মানীরা ফ্রান্সের অভ্যামত্মরে প্রবেশ করে ক্ষিপ্রতার সাথে অগ্রসর হ’তে থাকে। ফরাসী সরকারের পতন আসন্ন ঠিক সেই মুহূর্তে ভারী পানি লন্ডনে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

১৯৪১ সালে পারমানবিক বোমা নির্মাণের উদ্দেশ্যে ব্রিটেনের ‘টিউব এলয়েজ’ নামক একটি সংস্থা গঠিত হয়। একই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ম্যানহাট্রন’ প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪২ সালে। অনেক কাঠখড় পোড়ানের পর অবশেষে ১৯৪৫ সালে পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটানোর প্রস্ত্ততি পর্ব শেষ হয়। ১৯৪৫ সালে ১৬ জুলাই সূর্যোদয়ের ১ ঘণ্টা আগে বিস্ফোরিত হয় প্রথম পারমানবিক বোমা। পৃথিবীর এই প্রথম পারমানবিক বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করতে যে সব বিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন তাদের সবারই মোটামুটি একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, ওপেনহাইমার স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, ‘উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ হেসেছিলেন, কয়েকজন কেঁদে ফেলেছিলেন, তবে বেশীর ভাগ ছিলেন স্তব্ধ’।

উপসংহার :

হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে আঁতকে উঠেছিল পৃথিবীবাসী। তবে সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে অনুশোচনার কোন চিহ্ন অবলোকন করা যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুমান এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টল চার্চিল দু’জনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। হিরোশিমা-নাগাসাকির খবর পেয়ে তারা অভিভূত হয়েছিলেন এবং আশেপাশের লোকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, This is the greatest thing in history. It’s time for us to get home.

তবে নিশ্চুপ ছিলেন আইনস্টাইন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কি ধরণের অস্ত্র ব্যবহার হ’তে পারে’। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘I Know most with what weapons world war 111will be fought, but world war iv will be fought with sticks and stongs’.

তিনি হয়তো ধারণা করে এই বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা এটাই। কারণ ৫০’এর দশকের শুরুর দিকে রাশিয়া এবং আমেরিকা পারমানবিক বোমার এক নোংরা প্রতিযোগিতায় নামে। মার্কিনীরা ২০ কিলোটন TNT সমপরিমাণ বিস্ফোরণ ঘটালে রাশিয়া ফোটাবে ৪০ কিলোটন TNT সমপরিমাণ। আমেরিকা ১ মেগাটন ফোটালে রাশিয়া ১০ মেগাটন ফোটাবে। এই নোংরা খেলা চলে প্রায় ২৫ বছর। ১৬ কিলোটন TNT সমপরিমাণ বোমার টেলায় হিরোশিমা ও নাগাসাকি উড়ে গিয়েছিল। এখন আমরা মেগাটনের সময়ে উপস্থিত হয়েছি। পারমানবিক বোমার নোংরা খেলা খেলতে খেলতে এক সময় দেখা যাবে সাম্রাজ্যবাদীদের লোলুপ দৃষ্টি আবার পড়েছে কোন হিরোশিমা-নাগাসাকি নামক নগরীর উপর। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর সভ্যতার উপর ভিত্তি করে প্রযুক্তি ভুল ব্যবহারের কারণে দিতে হয়েছে অসংখ্য প্রাণের আত্মাহুতি। তাই সাম্রাজ্যবাদীদের আত্ম অহংকারের কারণে আবার যেন কোন প্রাণীর আত্মাহুতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আলস্নাহ আমাদের হেফাযত করুন-আমীন!!

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম, (তাওহীদের ডাক)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button