ইতিহাস

আইনে জালূত যুদ্ধ : তাতারদের বিজয়াভিযানের পরিসমাপ্তি

আইনে জালূত ছিল মুসলমানদের হারানো চেতনা নতুন করে জাগানোর যুদ্ধ। চেঙ্গীস খানের নেতৃত্বে কয়েক দশক ধরে যে তাতারঝড় লন্ডভন্ড করেছিল মধ্য এশিয়া ও ইসলামী খিলাফতের রাজধানী বাগদাদকে, মাত্র অর্ধশত বছরে রাজত্ব বিস্তার করেছিল অর্ধ পৃথিবীতে, আইনে জালুতে তা মুখ থুবড়ে পড়েছিল মামলুক প্রাচীরের সামনে। প্রথমবারের মত কারাকোরাম থেকে সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এ সাম্রাজ্য মুখোমুখি হয়েছিল শক্ত চ্যালেঞ্জের, যা ইতিপূর্বে তারা কখনো কল্পনাও করেনি। যে তাতারদেরকে ভাবা হয়েছিল অজেয়, যাদের নাম শুনলেই শূন্য হয়ে যেত শহরের পর শহর, মামলুকদের আক্রমণের সামনে তাদের অসহায় আত্মসমর্পণ তাই শীতল করেছিল উম্মাহর হৃদয়।

কয়েক দশক আগে তাতারদের হাতে বন্দী বালক কুতুয নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এ যুদ্ধে, মুসলিম উম্মাহ যাকে চেনে আল-মালিকুল মুযাফফর সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুয নামে। এ যুদ্ধে নিজের রণদক্ষতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটান রুকনুদ্দীন বাইবার্স। প্রথমবারের মত ইটের বদলে পাটকেল মেরে তাতারদের থেঁতলে দেয়ার কৌশল রপ্ত করে মুসলমানরা, যা পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। তাই আইনে জালূতের যুদ্ধ ছিল হতাশার অন্ধকারে একচিলতে আশার আলো।

আইনে জালূতের সামগ্রিক পাঠ এখনো উম্মাহকে ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো অনুভূতি, যে অনুভূতি জাগাতে সুলতান কুতুয বলেছিলেন, আমরা যদি ইসলামের জন্য না লড়ি তাহ’লে কে লড়বে? এ যুদ্ধেই স্পষ্ট হয় আলেমদের ভূমিকা, শহর-নগরে তারা ছড়িয়ে দেন জিহাদী জাযবার অপূর্ব জাগরণ। জানা আবশ্যক যে, এই আইনে জালূতেই তালূতের মাত্র ৩১৩ সেনার নিকট পরাস্ত হয়েছিল তৎকালীন পরাশক্তি অত্যাচারী বাদশাহ জালূত।

পটভূমি :

হালাকু খান মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের উপর আধিপত্য বিস্তারের পরে আফ্রিকাকে করতলগত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই উদ্দেশ্যে প্রথমে মিসরকে দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে সিরিয়ার দিমাশকের পদচ্যুত সুলতান নাছের, হোমা যেলার শাসক মানছূর এবং নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিজেদের সন্তান-সন্ততিসহ বহু লোক মিসরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তারা কাত্বইয়ায় (قَطْيَةَ) পৌঁছলে মিসরের সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুয হোমার শাসকের সাথে সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ করে তাকে হোমা ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। কিন্তু সুলতান নাছের মিসরে না গিয়ে তীহে বানী ইসরাঈলের দিকে রওয়ানা হন। যদিও তার অধিকাংশ সঙ্গী-সাথীরা মিসরে গমন করে নিরাপত্তা লাভ করেছিল। যদি তিনি মিসরে যেতেন হয়তো তিনিও নিরাপত্তা লাভ করতেন। মিসরের সুলতানের সাথে পুরাতন শত্রুতার কারণে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে আতঙ্কিত ছিলেন সুলতান নাছের। পরবর্তীতে তিনি কারক (الْكَرَك) অঞ্চলে চলে যান। কিন্তু সেখানেও তিনি অবস্থান না করে বার্রিয়া (الْبَرِّيَّةِ) এলাকায় চলে যান। সেখানে আরব শাসকদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আরব শাসকেরা তাকে আশ্রয় দিয়ে বিপাকে পড়ে যান। কারণ তাতারী সৈন্যরা তাদের উপর আক্রমণ করে। তারা বহু মানুষকে হত্যা করে, বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করে, বাড়ি-ঘর ধ্বংস করে এবং বহু নারী ও শিশুকে বন্দী করে। তবে আরবরা তাদের ছেড়ে দেয়নি। তারাও তাদের পিছু নিয়ে একের পর এক হামলা চালাতে থাকে। এদিকে তাতার সৈন্যরা নাছেরকে গ্রেপ্তার করার জন্য অভিযান অব্যাহত রাখে। অবশেষে নাছের বারাকা যিযাতে তাতারদের হাতে বন্দী হ’লে তারা তার সন্তান ও ভাইসহ তাকে হালাকু খানের নিকট প্রেরণ করে। তখন হালাকু খান হালবে (বর্তমানে আলেপ্পোতে) অবস্থান করছিলেন। বন্দী থাকা অবস্থায় সুলতান নাছেরকে হত্যা করা হয়।[1]

১২৫১ সালে চেঙ্গীস খানের মৃত্যুর পর মংকে খান তাতার প্রধান নির্বাচিত হন। তিনি তার দাদা চেঙ্গীস খানের বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি তার ভাই হালাকু খানকে পশ্চিমের জাতিসমূহকে পরাস্ত করে রাজ্যগুলো দখল করার দায়িত্ব দেন।

পাঁচ বছর যাবত সেনাদল গঠনের পর ১২৫৬ সালে হালাকু খান অভিযান শুরু করেন। তিনি দক্ষিণ দিকে যাত্রা করেন। আত্মসমর্পণে অস্বীকারকারীদের ধ্বংস করে দেয়ার জন্য মংকে খানের নির্দেশ ছিল। হালাকু খান অভিযানকালে অনেক রাজ্য জয় করেন। তাদের অনেকে তার দলে সৈনিক সরবরাহ করেছে। বাগদাদ অভিযানের সময় সিলিসিয়ান আর্মেনীয়রা তার সাথে ছিল। অভিযানের সময় হাসাসিনরা[2] তার কাছে আত্মসমর্পণ করে। বাগদাদ ধ্বংসের ফলে কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন আববাসীয় খিলাফত ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর দিমাশকের আইয়ুবীয়দের পতন হয়। হালাকু খান দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে মামলুক সাম্রাজ্য জয় করার পরিকল্পনা করেছিলেন। এসময় মামলুকরা প্রধান মুসলিম শক্তি ছিল। এ সময় মিসরে মামলুক শাসক সাইফুদ্দীন কুতুয ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি মূলতঃ জালালুদ্দীন খাওয়ারিযম শাহের ভাগ্নে ছিলেন। তার প্রকৃত নাম ছিল মাহমূদ বিন মামদূদ।[3]

মিসরের সুলতানের উদ্দেশ্যে হালাকু খানের চিঠি :

১২৬০ সালে হালাকু খান কায়রোতে সুলতান মুযাফফর সাইফুদ্দীন কুতুযের কাছে চারজন দূত পাঠিয়ে আত্মসমর্পণের দাবী করেন। উক্ত চিঠির সারমর্ম ছিল-

‘পৃথিবীর সম্প্রসারণকারী এবং আকাশের উত্তোলক হে আল্লাহ তোমার নামে পূর্ব ও পশ্চিমের শাহেনশাহ মহান খানের পক্ষ থেকে এটি প্রেরিত হচ্ছে আমাদের তরবারি থেকে পলাতক মামলুক সুলতান মুযাফফর কুতুযের উদ্দেশ্যে। যিনি এই অঞ্চলে এসে প্রজাদের হত্যা করে আনন্দ উপভোগ করছেন। মুযাফফর কুতুয, তার আমীর-উমারা এবং সমগ্র মিসরবাসী ভাল করেই জানে যে, আল্লাহর যমীনে আমরা তাঁর সৈন্য। তাঁর ক্রোধ থেকে আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এবং যার উপর তাঁর ক্রোধ এসেছিল আমরা তার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের সাম্রাজ্য ও আমাদের কম্পন সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত থেকে আপনাদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। অন্যদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং পর্দা উন্মেচিত হওয়ার পূর্বে আত্মসমর্পণ করুন। অন্যথায় অনুতপ্ত হবেন এবং লাঞ্ছিত হবেন। যারা কাঁদে তাদের প্রতি আমরা দয়া করি না, যারা অভিযোগ করে তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাই না। আপনি শুনেছেন কিভাবে আমরা একটি বিশাল সাম্রাজ্য জয় করেছি এবং পৃথিবীকে দূষিতকারী বিশৃঙ্খলা থেকে একে বিশুদ্ধ করেছি। আমরা বিশাল অঞ্চল জয় করেছি, অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছি। আপনি আমাদের সেনাবাহিনীর ত্রাস থেকে বাঁচতে পারবেন না।

আপনাদের দায়িত্ব পলায়ন করা আর আমাদের করণীয় আপনাদের পিছু নেওয়া। আপনাকে কোন্ ভূমি আশ্রয় দিবে? কোন্ পথ আপনাকে মুক্তি দিবে? কোন্ রাষ্ট্র আপনাকে রক্ষা করবে? আমাদের তরবারি থেকে মুক্তি নেই। আমাদের ভীতি থেকে পলায়নের সুযোগ নেই। আমাদের ঘোড়াগুলি দ্রুতগামী, আমাদের তীর ধারালো, আমাদের তলোয়ার বজ্রের মত, আমাদের হৃদয় পর্বতের মত কঠিন এবং আমাদের সেনারা বালুর মত অগণিত। দুর্গ আমাদের আটকাতে পারবে না, কোন সেনাবাহিনী আমাদের থামাতে পারবে না। আল্লাহর কাছে আপনার দো‘আ আমাদের বিরুদ্ধে কাজে আসবে না। কারণ আপনারা হারাম ভক্ষণ করেন, কথা বলার সময় ছাড় দেন না, ওয়াদা এবং কসম ভঙ্গ করেন। আপনাদের মাঝে অবাধ্যতা ও নাফারমানী ছড়িয়ে পড়েছে। লাঞ্ছনা ও অবমাননার দুঃসংবাদ গ্রহণ করুন। (আল্লাহর বাণী) ‘সুতরাং আজ তোমাদেরকে হীনকর শাস্তির বদলা দেওয়া হবে এ কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে দম্ভ করতে এবং তোমরা পাপাচার করতে’ (আহকাফ ৪৬/২০)। আর অত্যাচারীরা সত্বর জানতে পারবে তাদের গন্তব্যস্থল কিরূপ! (আশ-শু‘আরা ২৬/২২৭)

আরও দেখুন:  ডান হাত দিলে বাম হাত জানবে না?

যে আমাদের সাথে যুদ্ধ চাইবে সে অনুতপ্ত হবে। আর যে আমাদের থেকে নিরাপত্তা চাইবে সে নিরাপদ হবে। যদি আপনি আমাদের শর্ত গ্রহণ করেন এবং আনুগত্য করেন তাহ’লে আপনি সে সকল সুযোগ-সুবিধা পাবেন যা আমরা পেয়ে থাকি। আর যদি অবাধ্যতা করেন তাহ’লে ধ্বংস হয়ে যাবেন। স্বহস্তে নিজেদের ধ্বংস করবেন না। সচেতনদের সতর্ক করা হ’ল। আপনাদের নিকট প্রতীয়মান যে, আমরা কাফির। আর আমাদের নিকট স্পষ্ট যে, আপনারা ফাজের (পাপী)। আমরা আপনাদের উপর এমন একজনকে কর্তৃত্ব দিয়েছি যার পূর্ব থেকে অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং সে তার কর্মস্প্রিহায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আপনাদের বিশাল সংখ্যক সৈন্য আমাদের নিকট সামান্য। আপনাদের প্রভাবশালীরা আমাদের কাছে পদদলিত। ছল-চাতুরী না করে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠা এবং এর অনিষ্টতা পৌঁছার পূর্বে দ্রুত আপনার জবাব দিন। তখন আমাদের থেকে কোন সম্মান, মর্যাদা ও সুরক্ষা পাবেন না। আমাদের থেকে ভয়ংকর দুর্যোগ দেখতে পাবেন। আপনাদের থেকে দেশ শূন্য হয়ে যাবে। আমরা যখন সংবাদ পাঠাই তখন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিই। আপনাদের সতর্ক করে জাগ্রত করেছি। এই মুহূর্তে আপনি একমাত্র শত্রু, যার বিরুদ্ধে আমরা অগ্রসর হয়েছি। আপনাদের ও আমাদের মধ্যে যারা হেদায়াতের অনুসরণ করে, তাদের যারা ধ্বংসলীলার পরিণতিকে ভয় করে তাদের উপর এবং মহান শাহানশাহের যারা অনুসরণ করে তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক’।[4]

পত্রের ভাষা প্রমাণ করে যে, সেটি কেবল তাতার নেতা হালাকু খান বা কাতবুগার একক কোন উক্তি ছিল না, বরং দিমাশক ও হালবের মুসলিম নেতা যারা তাতারদের নিকট নিজেদের বিক্রয় করে দিয়েছিল তাদের সংযোজিত পত্র। এই সুবিধাবাদী নেতারা হালাকু খানের নেতৃত্বকে সমর্থন জানিয়ে নিজেরা সুবিধা ভোগ করছিল। আর তাদের সহযোগিতায় তাতার সৈন্যরা বহু মুসলিমকে হত্যা করেছিল। যুগে যুগে মীরজাফরের মত এরা সুবিধাবাদী ছিল। যারা ব্যক্তিস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে মুসলিম জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। যদিও তারা পরবর্তীতে একই পরিণতি ভোগ করেছিল।

উক্ত পত্র পাওয়ার পর সুলতান কুতুয দেশের আলেম-ওলামা এবং অভিজ্ঞ নেতাদের ডেকে পরামর্শ সভায় বসেন। সেখানে প্রখ্যাত বিদ্বান ইযযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম (১১৮১-১২৬২খৃ.)ও উপস্থিত ছিলেন। তার নিকটে যুদ্ধের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ চাওয়া হ’লে তিনি বলেন,

إذا طرق العدو البلاد وجب على العالم كلهم قتالهم، وجاز أن يؤخذ من الرعية ما يستعان به على جهازهم، بشرط ألا يبقى في بيت المال شيء، وأن تبيعوا ما لكم من الحوائص والآلات، ويقتصر كل منكم على فرسه وسلاحه، وتتساووا في ذلك أنتم والعامة، وأما أخذ الأموال العامة مع بقاء ما في أيدي الجند من الأموال والآلات الفاخرة فلا.

‘যখন শত্রুরা রাষ্ট্রকে পদদলিত করে তখন সকল আলেমের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। আর বায়তুল মালে কোন সম্পত্তি অবশিষ্ট না থাকলে সৈন্যদের প্রস্ত্ততির জন্য জনগণের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ গ্রহণ করা জায়েয। আর আপনাদের যা কিছু সম্পদ ও যন্ত্রপাতি আছে তা বিক্রি করুন এবং আপনাদের প্রত্যেকেই তার ঘোড়া ও অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুন। এই নিয়ে এবং সাধারণ জনতাকে সাথে নিয়ে আপনি অগ্রসর হৌন। তবে সৈন্যদের হাতে বিলাসবহুল অস্ত্র ও সম্পদ থাকা অবস্থায় জনগণের সম্পদ সরকারী তহবিলে নেওয়া যাবে না’।[5]

অন্যদিকে সেনাপতি যাহের বাইবার্সও যুদ্ধের পরামর্শ দেন। অবশেষে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বাইবার্স কাতবুগার দূতদের হত্যারও পরামর্শ দেন। সুলতান কুতুয বাইবার্সের পরামর্শ পসন্দ করেন এবং বৈঠকের পর রাতেই কাতবুগার চারজন দূতকে হত্যা করে হালাকু খানের পত্রের জবাব দেন। দূতদের কাটা মাথা কায়রোর বাবে জুলাইলার ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।[6]

তাতার নেতা বারাকাহ খানের সহযোগিতা :

যুদ্ধের পূর্বে সুলতান বাইবার্স (بِيبَرْسُ) অন্যতম তাতার নেতা বারাকাহ খানের সহযোগিতা চেয়ে পত্র লিখেন। পত্র প্রাপ্তির পর বারাকাহ খান সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বাইবার্সকে পত্র লিখেন। সাথে তার সৈন্যদের গোপনে মুসলমানদের সাথে যোগদান করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। আইনে জালূতে অনেক তাতারী সৈন্য মুসলমানদের হয়ে হালাকু খানের সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। বারাকাহ খান পত্রে লিখেন,

‘ইসলামের প্রতি আমার ভালোবাসা সম্পর্কে আপনি জানেন। হালাকু খান মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে সেটিও আপনি জানেন। আপনি একদিক থেকে এগিয়ে আসুন আর আমি আরেক দিক থেকে এগিয়ে যাব। এভাবে আমরা তাদেরকে পিষে মারব বা শহর থেকে তাড়িয়ে দিব। আর হালাকু খানের হাতে যে রাজ্যগুলো ছিল তার সবগুলো আপনাকে দিয়ে দিব। সুলতান যাহের বাইবার্স এই পত্রের নির্দেশনার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।[7] তিনি বারাকাহ খানের আচরণে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তার বড় ছেলের নাম রেখেছিলেন বারাকাহ খান। উল্লেখ্য যে, চেঙ্গীস খানের অন্যতম নাতি ও তাতার নেতা বারাকাহ খান ইতিপূর্বে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খলীফা মুসতা‘ছিম বিল্লাহর হাতে বায়‘আত নেন। হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ আক্রান্ত হ’লে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং চাচাত ভাই হালাকু খানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সাথে সাথে তিনি তৎকালীন তাতার সম্রাট মংকে খানের নিকট পত্র লিখেন। তিনি তাতে বলেন, সে (হালাকু খান) মুসলিমদের সব শহরে হামলা করেছে এবং খলীফাকে হত্যা করেছে। আল্লাহর সাহায্য নিয়ে আমি তার কাছ থেকে এসব নির্দোষ মানুষের রক্তপাতের হিসাব আদায় করব।[8] পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বারাকাহ খানের সৈন্যরা হালাকু খানের সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে দুর্বল করে ফেলেন। আইনে জালূতের বিজয় তার অন্যতম ফলাফল।

যুদ্ধের ঘটনা প্রবাহ :

চেঙ্গীস খানের উত্তরসূরী মংকে খানের মৃত্যুর ফলে ভাই হালাকু খানসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় তাতার সেনাপতিরা নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য মঙ্গোলিয়ার রাজধানী কারাকোরাম ফিরে আসেন। হালাকু তার বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে তার সাথে নিয়ে যান। অন্য সৈন্যদের কমান্ডার হিসাবে রেখে যান কাতবুগাকে। তাতারদের প্রতিহত করার জন্য সুলতান সাইফুদ্দীন কুতুয দ্রুত একটি বাহিনী গঠন করে প্রথমে ফিলিস্তীনের দিকে অগ্রসর হন। পরে শা‘বান মাসে মিসরীয়রা দলবল নিয়ে তাতারদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। উদ্দেশ্য ছিল তাদের আগমনের পূর্বে তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে প্রতিহত করা। ইমাম ইবনু কাছীর (রহঃ) সুলতান কুতুযের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, بادرهم قبل أن يبادروه وبرز إليهم وَأَقْدَمَ عَلَيْهِمْ قَبْلَ أَنْ يُقْدِمُوا عَلَيْهِ ‘তারা তার কাছে আসার আগেই তিনি তাদের কাছে ত্বরান্বিত হ’লেন, তাদের দিকে অগ্রসর হ’লেন এবং তারা আক্রমণ করার পূর্বে তিনি আক্রমণ করলেন।[9] অভিযানকালে হোমার গভর্নর মানছূর, তার ভাই আফযাল ও যাহের রুকনুদ্দীন বাইবার্স সৈন্যসহ তার সাথে যোগ দেন।

আরও দেখুন:  ইতিহাস কথা বলে - ৩

সেনাপতি কাতবুগা সুলতান কুতুযের পরিকল্পনা ও দূত হত্যার কথা জানতে পেরে তার অনুগত হিমছের সানজাক আশরাফ, মুজীর ইবনুয যাকী ও কাযী মুহীউদ্দীনের সাথে পরামর্শে বসেন। এ সময় সেনাপতি কাতবুগা বিকা‘য় (البقاع) অবস্থান করছিলেন। কেউ পরামর্শ দিল যুদ্ধে না জড়ানোর, আবার কেউ হালাকু খানের আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলল। আবার কেউ যুদ্ধ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা ব্যক্ত করল। এই মতভেদপূর্ণ অবস্থায় কাতবুগা যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন।[10] ইতিপূর্বে তাতাররা তাদের বালবিকের শিবির থেকে গাযার দিকে যাত্রা করে। তারা এসময় আক্কাকেন্দ্রিক ক্রুসেডার জেরুজালেম রাজ্যের সাথে মিলে ফ্রাঙ্ক-তাতার মৈত্রী গঠনের চেষ্টা চালায়।

কিন্তু পোপ চতুর্থ আলেকজান্ডার এতে সাড়া দেননি। এছাড়া সাঈদার শাসক জুলিয়ানের কারণে কাতবুগার নাতি মৃত্যুবরণ করে। ফলে দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। কাতবুগা রাগান্বিত হয়ে সাঈদা আক্রমণ করেন। অন্যদিকে মামলুকরাও তাতারদের বিরুদ্ধে সহায়তার জন্য ক্রুসেডারদের প্রতি বার্তা পাঠায়।

মামলুকরা ফ্রাঙ্কদের দীর্ঘদিনের শত্রু হ’লেও তাতারদের বেশী ক্ষতিকর হিসাবে বিবেচনা করেন। এসময় খৃষ্টানেরা দুই পক্ষের মধ্যে কারো সাথে সরাসরি যোগ না দিয়ে ক্ষতি না করার শর্তে মামলুকদেরকে ক্রুসেড এলাকার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার সুযোগ দেয়। তাতাররা জর্ডান নদী অতিক্রম করার খবর পাওয়ার পর সুলতান কুতুয দক্ষিণ পশ্চিমে জাজরিল উপত্যকার বাইসানের (بيسان) পশ্চিম পার্শ্বে আইনে জালূতের দিকে অগ্রসর হন। যদিও খৃষ্টানেরা দিমাশকে হামলা চালিয়ে শহরে শহরে ক্রুশ ঝুলিয়ে দেয়। পরে সুলতান বাইবার্স তা দখল করে মুসলমানদের ফিরিয়ে আনেন এবং বিক্ষুব্ধ জনতা মারিয়াম গীর্যা পুড়িয়ে দেয়।[11]

২৫শে রামাযান ৬২৫ হিজরী। সেনাপতি কাতবুগা ছুবাইবার (الصُبَيْبَة) শাসক সাঈদ ও হিমছের গভর্নর আশরাফ এবং তাদের সৈন্য নিয়ে বাইসানের পথে এগিয়ে যান। এদিকে সুলতান কুতুয পত্র মারফত আশরাফ ও সাঈদকে তাতারদের পক্ষ ত্যাগ করার আহবান জানান। সাথে এই আশ্বাসও দেওয়া হয় যে, তাদেরকে তাদের স্বপদে বহাল রাখা হবে। হিমছের শাসক আশরাফ যুদ্ধের ময়দানে কাতবুগার পক্ষ ত্যাগ করে সুলতান কুতুযের পক্ষে লড়াই করার আশ্বাস প্রদান করেন। এতে সুলতান কুতুযের যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আরো বেড়ে যায়।

আইনে জালূতে উভয় দলের সৈন্যরা মিলিত হয়। রামাযান মাসের জুম‘আর দিন। রাসূল (ছাঃ)-এর বদর যুদ্ধের ইতিহাসের সাথে অনেকটা মিল। কৌশল হিসাবে সুলতান কুতুয তার বাহিনীর একটি অংশকে স্থানীয় পাহাড়ে লুকিয়ে রাখেন এবং বাইবার্সকে একটি ক্ষুদ্র সেনাদল দিয়ে সামনে পাঠিয়ে দেন। বাইবার্সকে সামনে দেখে কাতবুগা মন্তব্য করে বলেন, إن ولّينا كَسَرنا الإِسْلَام ‘আমরা বিজয়ী হ’লে ইসলামকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিব’।[12] উভয়পক্ষ মুখোমুখি হওয়ার পর তাতার সৈন্যদের ফাঁদে ফেলার জন্য বাইবার্স হিট-এন্ড-রান (আঘাত করে পালানো) কৌশল কাজে লাগান। আক্রমণ করে মামলুকরা পালিয়ে যাচ্ছে দেখে তাতার বাহিনী তাদের ধাওয়া করে। তাতার সেনাপতি কাতবুগা এই ফাঁদ বুঝতে না পেরে অগ্রসর হন। এরই মধ্যে পাঁচশত মুসলিম বীর বাইবার্সের সাথে যোগদান করেন। কিছুক্ষণ না যেতেই আরো পাঁচশত সৈন্য যোগদান করেন। অন্যদিকে আত্মগোপনকারী মুসলিম বাহিনী বিভিন্ন দিকে থেকে বেরিয়ে এসে আক্রমণ চালায়। ফলে তাতার বাহিনী চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

তাতার বাহিনী বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্ট চালায়। সুলতান কুতুয কিছু দূরে তার নিজস্ব সেনাদল নিয়ে যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। এসময় তাতার বাহিনী মামলুক বাহিনীর বাম অংশকে প্রায় ভেদ করতে সক্ষম হয়। সুলতান কুতুয এসময় তার যুদ্ধের হেলমেট খুলে ফেলেন যাতে সৈন্যরা তাকে সহজে চিনতে পারে। এরপর তিনি তার সেনাদল নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। তাতার বাহিনী পিছু হটে কিছু দূরে গিয়ে সংগঠিত হয়ে পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। তবে যুদ্ধের ফলাফল মুসলমানদের পক্ষে চলে যায়। সেনাপতি কাতবুগার দেহরক্ষীরা একে একে মারা যায়। কেউ তাকে রেখে পলায়ন করে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে কাতবুগা একাকী হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় সে সুলতান কুতুযের উপর আক্রমণ করে। কিন্তু তাকে প্রায় এক হাযার মুসলিম সৈন্য ঘেরাও করে ফেলে। অবশেষে তিনি মুসলমানদের হাতে বন্দী হন।[13]

মৃত্যুর পূর্বে সুলতান কুতুযের সাথে সেনাপতি কাতবুগার কথপোকথন :

বন্দী অবস্থায় সে সুলতান কুতুযকে বলতে থাকে- হে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বহু মানুষের রক্ত ঝরানোর পর তুমি এখানে? বহু বীর ও সম্মানীদের ওয়াদা দিয়ে ভঙ্গ করেছ। প্রতারণার মাধ্যমে বহু মানুষের বাড়ি-ঘর ধ্বংস করেছ। আজকে যদি আমি তোমার হাতে মারা যাই তা হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার পক্ষ থেকে নয়। এই তরিৎ হামলা ও প্রতারণা দ্বারা তুমি ধোঁকা দিবে না। কারণ যখন হালাকু খানের কাছে আমার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছবে তখন তার রাগের সাগর টগবগ করে ফুটবে। আযারবাইজান থেকে মিসরের প্রতিটি স্থানকে তার ঘোড়া পদদলিত করবে। খুব শীঘ্রই তাদের ঘোড়ার পদাঘাতে মিসরের বালি চিকচিক করবে। কাতবুগার মত হালাকু খানের তিন লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্য রয়েছে। তুমি যদি আমাকে হত্যা কর তাহ’লে একজন মাত্র কমে যাবে। এর জওয়াবে সুলতান কুতুয বলেন, তোমার অশ্বারোহী সৈন্যদের নিয়ে তুমি গর্ব করো না। কারণ তারা ধোঁকা ও প্রতারণার মাধ্যমে তাদের কার্যকলাপ পরিচালনা করে। বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্বের মাধ্যমে নয়। যেমন রুস্ত্তম বিন দাস্তান ছিল।

উত্তরে কাতবুগা বলে,إني كنت عبداً للملك ما حييت ولست مثلك ماكراً وغادراً، ‘আমি যতদিন জীবিত ছিলাম মালিকেরই (তাতার রাজার) দাস ছিলাম। তোমার মত প্রতারক ও ধোঁকাবাজ ছিলাম না। এই কথা শোনার পর সুলতান কুতুয তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। সৈন্যরা তার দেহ থেকে মাথাকে আলাদা করে দেয়। এ সময় তার ছেলেকে বন্দী করা হয়। এই অঞ্চলের তাতার বাহিনীর প্রায় সম্পূর্ণ অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। যারা অস্ত্রের আঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল তারা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। মুসলমানরা তাদের ধাওয়া করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এমনকি তাদের খাবার ও অন্যান্য মাল-সামান আগুনের গোলা মেরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কিছু সৈন্য পূর্বদিকে পলায়ন করে। তাদের ধাওয়া করতে সুলতান কুতুয অন্যতম সেনাপতি বাইবার্সকে প্রেরণ করেন। অন্যদিকে তাতার বাহিনীর সহযোগী হিমছের গভর্নর আশরাফ মূসা আত্মসমর্পণ করে ও সুলতান কুতুযের নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা করে। সুলতান তাকে নিরাপত্তা দান করেন এবং হিমছের গভর্নর হিসাবে স্বপদে বহাল রাখেন। ছুবাইবার শাসক সাঈদকেও বন্দী করা হয়। তাকে সুলতান কুতুযের নিকট আনা হ’লে মুসলমানদের বিরুদ্ধে রক্তপাতের অপরাধে তিনি তাকে হত্যার নির্দেশ দেন।[14]

আরও দেখুন:  আহারে জীবন

ঐতিহাসিক আবু শামাহ বলেন, ২৭শে রামাযান রাতে আমাদের কাছে সংবাদ পৌঁছে যে, মুসলিম সৈন্যরা ২৫শে রামাযান জুম‘আর দিনে আইনে জালূতে তাতারদের সাথে যুদ্ধে মিলিত হন এবং তাদের উপর আক্রমণ করে তাদের হত্যা করেন। তারা সেনাপতি কাতবুগাকে হত্যা করেন এবং তার ছেলেকে বন্দী করেন।[15]

হাত কামান বা আগুনের গোলা ব্যবহার হয়েছে এমন যুদ্ধসমূহের মধ্যে আইনে জালূতের যুদ্ধ অন্যতম প্রাচীন যুদ্ধ হিসাবে উল্লেখযোগ্য। তাতারীয় ঘোড়া ও অশ্বারোহীদের মধ্যে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য মামলুকরা এসমস্ত বিস্ফোরক ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে আরব রসায়ন ও সামরিক নিয়ম-কানূনে বিস্ফোরক হিসাবে বারুদ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।[16]

যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থা :

যুদ্ধ শেষে সুলতান কুতুয হোমার শাসক মানছূরকে হোমা ও বারীনের শাসক বানিয়ে দেন। সাথে সাথে তাকে মাআর্রা শহর ফিরিয়ে দেন। এরপরে সুলতান কুতুয, সৈন্যদের সাথে নিয়ে দিমাশকে প্রবেশ করেন। দিমাশকে সুলতান কুতুযের প্রবেশ ও এই বিজয়ে মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কারণ তারা তাতারদের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রাপ্তির ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল। আর এই সময় অধিকাংশ আরব ভুমি তাতারদের অধীনে চলে গিয়েছিল। তিনি সিরিয়াতে গিয়ে তাতারদের সাথে সংশ্লিষ্ট বহু মানুষকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেন। যাদের মধ্যে হোসাইন আল-কুরদী ও নাছের ইউসুফ অন্যতম ছিলেন।[17] অন্যদিকে বাইবার্স হালবের দিকে রওয়ানা দেন এবং হালব থেকে তাতারদের বিতাড়িত করেন। সুলতান কুতুয তাকে হালবের শাসক বানানোর ওয়াদা করেছিলেন। সুলতান কুতুয হালবেও যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাইবার্স তা অপসন্দ করলে তিনি মিসরে ফিরে যান।

কাতবুগার মৃত্যুতে হালাকু খানের প্রতিক্রিয়া :

হালাকু খানের নিকট কাতবুগার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছলে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে যান। আর শোকে বলতে থাকেন, ‘তার মত আর একজন খাদেম কোথায় পাব, যে তার মৃত্যুর সময়ে এমন ভাল উদ্দেশ্য এবং এমন দাসত্ব দেখায়?[18] হালাকু খান কাতবুগার হত্যার প্রতিশোধ নিতে দ্বিতীয়বার সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু একদিকে বড় ভাই ও তাতার সম্রাট মংকে খানের মৃত্যু অন্যদিকে চাচাতো ভাই সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী বারাকাহ খানের হুমকির প্রেক্ষিতে সিরিয়া ও মিসরের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকেন। আর এভাবেই আরব অঞ্চলে তাতারদের দীর্ঘ অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটে।

উপসংহার :

চীন থেকে আগত তাতাররা খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুরো বিশ্বকে তাদের কব্জায় আনতে সক্ষম হয়। তাদের শাসন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করে। সমরকান্দ, বুখারা, খাওয়ারিযম, আফগানিস্তান, ভারত, রাশিয়া, ইরাক, ইরান এমনকি মুসলিম খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র বাগদাদও দখল করে। বাগদাদের অমূল্য সম্পদ তারা আযারবাইজানে নিয়ে যায়। মুসলমানদের জ্ঞান শূন্য করার জন্য তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। বায়তুল হিকমার অগণিত কিতাবাদি ফোরাত নদীতে নিক্ষেপ করে। অনেক লাইব্রেরী আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধসহ বহু মানুষকে হত্যা করে। বহু বাড়ি-ঘর ও ধন-সম্পদ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তারা মুসলিম-অমুসলিম কোন পার্থক্য করত না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জমি-জায়গা ও ধন-সম্পদ। এগুলো দখলে যারা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদেরকেই তারা ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু তারা আরব ভূমিতে বেশী দিন টিকে থাকতে পারেনি। তাতার নেতা সম্রাট গাযানের বিরুদ্ধে স্বয়ং ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) আলেম-ওলামাদের সাথে নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। অন্যদিকে মিসরের প্রখ্যাত আলেম ইযযুদ্দীন বিন আব্দুস সালাম তাতার নেতা কাতবুগার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। এভাবে তুর্কী নেতা আরতুগ্রুল, তার ছেলে ওছমান, খাওয়ারিযম নেতা জালালুদ্দীনসহ সুলতান বাইবার্স, সুলতান কুতুয এবং অন্যান্য আরব নেতাদের সংগ্রামের ফলে তাতার শাসনের অবসান ঘটে। যদিও বারাকাহ খান ও তাতার নেতা তায়মূর খানের ইসলাম গ্রহণ এদেরকে অনেকাংশে সহায়তা করে।

আইনে জালূতের যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ ছিল যাতে তাতাররা চরমভাবে পরাস্ত হয়। আর এই পরাজয়ের মাধ্যমে কেবল মিসর নয় বরং সমগ্র আরব বিশ্ব মুক্তি পায় তাতারদের কুশাসনের কবল থেকে। জীবিত তাতার সৈন্যরা ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে থাকে ইসলামের ছায়াতলে। যে তাতার শাসকদের দিয়ে আল্লাহ বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছিলেন সেই তাতার নেতাদের দিয়েই আল্লাহ তা‘আলা আরব বিশ্বসহ সারা বিশ্বে শান্তির বার্তা পৌঁছে দেন। আর এভাবেই একটি জাতির দীর্ঘ অন্ধকারাচ্ছন্ন শাসনের যবানিকপাত ঘটে। বর্তমান শাসক ও ক্ষমতাশালীদের এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন পরিচালনা করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

– মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম (মাসিক আত-তাহরীক)


[1]. আল-বিদায়াহ ১৩/২২০-২২

[2].হাসাসিন শী‘আ ইসমাঈলী মতবাদের একটি গোষ্ঠী। তৎকালীন পারস্য ও সিরিয়ায় তারা গুপ্তহত্যা কর্মকান্ড চালাত। ১১ শতকে জন্ম নেওয়া এই গোষ্ঠীটি সুন্নী সেলজুকদের জন্য মারাত্মক সামরিক হুমকি তৈরী করে।

[3]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ২৩/২০০-২০১

[4]. মাকরেযী, আস-সুলূকু লি মারিফাতি দুয়ালিল মুলূক ১/৫১৪-১৫

[5]. জালালুদ্দীন সুয়ূতী, তারীখুল খুলাফা ১/৩৩৪-৩৫

[6]. রশীদুদ্দীন হামাদানী, জামে‘উত তাওয়ারীখ ২/৩১০-১৪; তারীখে ইবনু খালদুন ৫/৪৩৭

[7]. আল-বিদায়াহ ১৩/২৩৮

[8]. রশীদুদ্দীন হামাদানী, জামে‘উত তাওয়ারীখ ২/৩১৪-১৬

[9]. আল-বিদায়াহ ১৩/২২০-২২

[10]. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ৪৮/৬১

[11]. যাহাবী, আল-ইবারু ফী খাবরি মিন গুবার ৩/২৮৮

[12]. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ৪৮/৬১

[13]. রশীদুদ্দীন হামাদানী, জামে‘উত তাওয়ারীখ ২/৩১৪

[14]. রশীদুদ্দীন হামাদানী, জামে‘উত তাওয়ারীখ ৩১৪-১৭ পৃ.; আবুল ফিদা-মুখতাছারু তারীখিল বাশার ৩/২০৫

[15]. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ৪৮/৬১

[16]. রশীদুদ্দীন হামাদানী, জামে‘উত তাওয়ারীখ ২/৩১৪

[17]. আবুল ফিদা, মুখতাছার তারীখিল বাশার ৩/২০৫

[18]. জামে‘উত তাওয়ারীখ ২/৩১৭

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button