তথ্য-প্রযুক্তি/মিডিয়া

জিহাদি বইয়ের সংজ্ঞা কী?

জঙ্গিবাদ কিংবা ধর্মীয় উগ্রতাকে বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে তারা পাকড়াও হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তখন বলা হয় যে, তাদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়েছে। জিহাদি বইয়ের মূল সংজ্ঞা কী তা জানা না থাকলেও অবাক করার মতো বষিয় হলো, সকল প্রকার ইসলামি ভাবধারায় লিখিত বইকেই কিংবা আরবিতে লেখা সাহিত্য-ইতিহাসের বইকেও জিহাদি বই বলে প্রচার চালানো হয়। দেশের তথাকথিত কিছু ইসলাম বিদ্বেষী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জিহাদি বই উদ্ধারের সংবাদ ফলাও করে প্রচার-প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ আশুলিয়ার ব্যাংক ডাকাতিতে জড়িত যে ডাকাতদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের রুম থেকেও অসংখ্য জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়েছে বলে কিছু টিভি ও পত্রিকায় এসেছে। টিভিতে যখন এ বিষয়ক সংবাদটি দেখছিলাম তখন দেখলাম উদ্ধারকৃত জিহাদি বইয়ের স্তূপে অসংখ্য বই! তার মধ্যে ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’ নামক বইটিতে চোখ আটকে গেল। আরও যে সকল বই ছিল তার মধ্যে সে অর্থে উগ্রবাদী বিষয়ক লেখা কোনো বই চোখে পড়েনি। তখন থেকে ভাবছিলাম তাজকেরাতুল আউলিয়া কিংবা এ জাতীয় বই ‘জিহাদি বই’ হল কীভাবে? প্রশাসনের ভাষ্যমতে, এগুলো যদি সত্যিকারার্থেই জিহাদি বই হয় তবে তো এদেশের সকল মুসলমান মুজাহিদ। ঢালাওভাবে ইসলামিক ভাবধারার সকল বইকে জিহাদি বই বলে প্রচার চালানোর প্রয়াস কি অজ্ঞতার কারণে নাকি ইসলামের প্রতি বিদ্বেষাত্মক মনোভাব থেকে সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার। কেননা সকল ইসলামিক বইকে যদি ঢালাওভাবে জিহাদি বই বলে প্রচার করার প্রবণতা বর্তমান সময়ের মতো চলতে থাকে কিংবা বৃদ্ধি পায় তবে তা ভবিষ্যতের জন্য মোটেই শুভ বার্তা বহন করবে না এবং ‘জিহাদি বই’ সংক্রান্ত এমন সংবাদ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করতে থাকবে ।

আরও দেখুন:  ফেসবুক ব্যবহারে কিছু ইসলামী নির্দেশনা

জিহাদি বই বিষয়ক ধারণাটি ইসলাম বিদ্বেষী চক্রান্ত থেকে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে এবং আমরা বিনা-বিচারে সেটা ধারণ ও প্রচার করছি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং আশপাশের এলাকার মুসলমানদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রথম ‘জিহাদি বই’ উদ্ধার তত্ত্বের সূত্রপাত ঘটায়। মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব বিশ্বের ওপর পশ্চিমা আগ্রাসন থেকেও ‘জিহাদি বই’ উদ্ধারের কিছু ঘটনা প্রকাশ পায়। বাংলাদেশে ইসলামিক বইকে ‘জিহাদি বই’ বলে প্রচার চালানোর ঘটনা ঠিক কাদের স্বার্থে সেটা এখনো ততোটা স্পষ্ট না হলেও ৯২ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশের প্রশাসন সকল ইসলামি বইকে ঢালাওভাবে ‘জিহাদি বই’ বলে প্রচার চালাবে; এটা দুঃখজনক। মনে রাখা উচিত, কোনো বইতে আরবি বর্ণমালা বা আরবি বাক্য থাকলেই সেটাকে ‘জিহাদি বই’ বলে প্রচরণা চালানো অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে। ধর্মকে অপব্যাখ্যা করে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বা মহল অপব্যাখ্যামূলক কিছু বই লিখেছেন যা মানবতার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই বলে সকল ইসলামি বইকে ‘জিহাদি বই’ বলার প্রবণতা কেন? ‘জিহাদি বই’ নিয়ে প্রশাসনের এত মাথা ব্যথা তবু কেন তারা ‘জিহাদি বই’ সমূহের একটি তালিকা করে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে সেগুলো ক্রয় ও পঠন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ এবং সে বইগুলো মুদ্রণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করছে না? ইসলামি ঘরাণার সকল বইকে ঢালাওভাবে ‘জিহাদি বই’ বলে অপপ্রচার চালানোয় ক্ষমতাসীনদের প্রতিও মানুষের নেতিবাচক মনোভাব জন্মে; এটা তাদেরকেও বুঝতে হবে। জঙ্গি ও ডাকাতদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত কথিত জিহাদি বইয়ের কিছু কিছু বই ইসলামি ফাউন্ডেশন থেকেও প্রকাশিত। ইসলামি ফাউন্ডেশন যেহেতু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে সুতরাং এ সকল বই যদি জিহাদি বই হয় তবে এ জাতীয় বইয়ের ব্যবসায় সরকারও জড়িত বললে অযৌক্তিত দাবি তোলা হবে? পৃথিবীর সকল ধর্মেই কিছু না কিছু উগ্রপন্থীর সৃষ্টি হয়েছে তাই বলে এর জন্য ধর্মকে দায়ী করা চরম মূর্খতার সামিল। উগ্রপন্থীদের দমন করা শাসকদের দায়িত্ব কিন্তু সাধারণ মুসলমানের বিশ্বাস ও মূল্যবোধে আঘাত করা উচিত নয়। কোন খুনীর কাছে শেক্সপিয়রের রচনাসামগ্রী পেলে সেই খুনীকে খুন কর্মে উৎসাহিত করার কারণ হিসেবে সে বইকে যেমন দায়ী করা যায় না তেমনি কোনো খুনীর কাছে ইসলামি ভাবধারার কোনো বই পেলে খুনের কারণ হিসেবে সেই বইগুলোকে দায়ী করা অজ্ঞতার নামান্তর। বইয়ের শিক্ষা মানুষকে অবশ্যই প্রভাবিত করে কিন্তু তাজকেরাতুল আউলিয়া কিংবা ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত কোনো বই অপরাধীকে বোমা তৈরিতে, নিক্ষেপ করতে কিংবা ব্যাংক ডাকাতির মতো নৃসংশ কর্মে উৎসাহিত করবে, শিক্ষা দিবে এ কথা বোকামি ছাড়া কিছু না।

আরও দেখুন:  সৎ মিডিয়া বনাম অসৎ মিডিয়া

সুতরাং প্রশাসন এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিকতার পরিচয় দিবে বলে আশা রাখি। ঢালাওভাবে সকল ইসলামি বইকে ‘জিহাদি বই’ বলার গর্হিত প্রবণতা ত্যাগ করার উদাত্ত আহ্বান জানাই। যে সকল বই শান্তিপূর্ণ ইসলামের অন্তরায় সে বইয়ের তালিকা করে তা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হলেই সম্ভবত সমস্যার সমাধান হবে। অযথা সাধারণ মুসলমানের অন্তরে আঘাত ও অযথা বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করে বোধহয় কোনো পক্ষেরই ক্ষতি ছাড়া উপকার নেই। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা অজ্ঞতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য আন্তরিকতা দেখানো সময়ের দাবি। ইসলাম ও মুসলমানের নামে অপবাদ ও দুর্নাম রটিয়ে যদি অন্য কোনো বৃহৎ শক্তির মদদ প্রাপ্তির মানসিকতা থাকে তবে তা-ও পরিহার করা উচিত। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হৃদয়ের ভাষা বোঝার মতো দক্ষতা তৈরি হওয়া বাঞ্ছনীয়। বই নিয়ে যেন কোনো কোন্দলের সৃষ্টি করা না হয় সেজন্য সজাগ ও তৎপর হতে হবে। বই আত্মার খোরাক। সে খোরাক সাধারণ বই থেকে যেমন পূর্ণ হতে পারে তেমনি ইসলাম বিষয়ক কিংবা ধর্ম বিষয়ক বই দ্বারাও পূর্ণতা পেতে পারে। সকল প্রকার কলুষতা দূর করে মনের উন্নতি ঘটাতে বইয়ের বিকল্প নেই। দেশের মানুষকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে একমাত্র বই। সাধারণ বইয়ের চেয়ে ধর্মীয় বই মানুষকে বহুগুণ বেশি নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেয়। সুতরাং মানুষের মনের ভীতি দূর করে ধর্ম বিষয়ক বইকে বাধাহীন-অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দায়িত্বশীলদের প্রতি এ কর্তব্যটুকু পালনের বিনীত অনুরোধ রাখছি। টলস্টয়ের মতো যেন আমরাও বলতে পারি, ‘জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই এবং বই’।

– রাজু আহমেদ, ইনকিলাব।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button