ইতিহাস

মুঘল আমল ও শিরক-বিদ’আতের প্রবাহ

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ইতিহাসে মুঘল যুগ এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আর ভারত ইতিহাসে যে সকল সম্রাট শ্রেষ্ঠত্বের আসন পেয়েছেন মহামতি আকবর তাদের অন্যতম। বাবর হতে বাহাদুর শাহ পর্যন্ত সবাই কম বেশি শিক্ষিত। ব্যতিক্রম কেবল আকবর। বাবরের আত্মজীবনী, গুলবদনের হুমায়ূন নামা, জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী, দারা শিকোর দার্শনিক রচনা, আওরঙ্গজেবের ফতোয়া-ই-আলমগীরি ইত্যাদি হতে জানা যায় মুঘল সাম্রাজ্যের কথা। আর ব্যতিক্রমী আকবর ছিলেন নিরক্ষর।

বিগত শতাব্দীর ছয়ের দশকে আমাদের (লেখকের) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ হতে Historical Tour এ সারা উত্তর-ভারত ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ২৫ জন ছাত্রের মধ্যে আমিই (লেখক) একমাত্র মুসলিম। তুফান এক্সপ্রেসে গিয়ে আগ্রার রাজা-কি-মান্ডি স্টেশনে নেমে ঠাঁই হল আগ্রার শিলাজা হোটেলে। সকালেই রিজার্ভ বাসে ফতেহপুর সিক্রি। আকবর বাদশাহের রাজধানী। নামতেই বাঁ হাতে পড়ল বিরাট তোরণ-বুলন্দ-দরওয়াজা। ভারতের সর্বোচ্চ গেট। গেট ছাড়িয়ে ঢুকতেই আকবর বাদশাহর ধর্মগুরু সেলিম চিশতীর মাজার। সাদা মার্বেল পাথরের জাফরি দিয়ে ঘেরা। গাইড ইকবাল আহমাদ কোরেশী বলে চলেছেন –“আপকা যো এরাদা হ্যায় ইয়াদ করণে কে বাদ আপনা কাপড়া ফাড় কার বাঁধ দিজিয়ে।” (অর্থাৎ আপনার যা ইচ্ছা বা আশা তা মনে করে নিজের কাপড় ফেড়ে তা বেঁধে দিন) জাফরিগুলো ছোঁড়া কালিতে ভর্তি। পাশে কাওয়ালী গানের আসর। পায়ে পায়ে এগোতেই দেখি একটা মিনার। গাইড বললেন –“হিরণ মিনার। আকবর বাদশা কা এক হাতী থা উসকা মাকবারা।”

এক কথায় হাতীর কবরে মিনার। পাশেই হাওয়া মহল। চারতলা, বেগমদের হাওয়া (বাতাস) খাবার স্থান। উপরে উঠলাম, ওখান হতে জয়পুর দেখা যাচ্ছে। পাশেই দাবা খেলার জন্য বড় হল ঘর। সাদা কালো মার্বেল টালি বসানো। এক একটি ঘরে এক একটি যুবতী মেয়েকে খুঁটি হিসাবে ব্যবহার করতেন বাদশাহ –জানালেন গাইড, সত্য-মিথ্যা আল্লাহই জানেন। ওখান হতে এগোতেই চোখে পড়ল গোটাটাই লাল পাথরে বাঁধানো একটা বড় পুকুর, যার উপর কোণা-কুণি দুটি রাস্তা মিশেছে পুকুরের মাঝখানে। বর্তমানে ফ্লাইওভারের মত। আর ওটাই তানসেনের আসন। পুকুরের পাশেই বাদশাহের শোবার ঘর। নিশান্তে (রাতের শেষে) আযানের পরিবর্তে তানসেনের ছয় রাগ ছত্রিশ রাগিনীর সুললিত ব্যঞ্জনায় ঘুম ভাঙ্গতো দিল্লীশ্বরের। এবার দেওয়ান-ই-আম (সাধারণ সভাগৃহ) ও দেওয়ান-ই-খাস (বিশেষ সভাগৃহ) এবং আকবর বাদশাহর যোধপুরী বেগমের শোবার ঘর যোধাবাই প্যালেস, মন্দির প্যাটার্নের এক বিরাট মহল। দেওয়ালের চারিপাশে রাম-সীতা হনুমান প্রভৃতির ছবি আঁকা। আর অনেক খালি তাক। গাইড জানালেন –“যব্ আওরঙ্গজেব আয়া তো তাক্ সে সব মূর্তি লেকার যমুনা কে পানিমে ডাল দিয়া।” (অর্থাৎ যখন আওরঙ্গজেব আসলো তখন সে তাক থেকে মূর্তিগুলো নিয়ে যমুনার পানিতে ফেলে দেয়) অমুসলিম সহপাঠীদের মধ্যে কেউ কেউ অশ্লীল মন্তব্য করে বসল। আর আমি মর্মে মর্মে দহন জ্বালা সহ্য করলাম। একমাত্র তাই। আর বলতে ইচ্ছে জাগলো -হায় মহামতি! তুমি না মুসলিম, কিন্তু বলতে পারলাম না।

আরও দেখুন:  মুসলমানদের উন্নতির জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কি ঘটছে?

ঐতিহাসিক পার্সিভ্যাল স্পীয়রের মতে আকবর তার রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য দ্বীন-ই-ইলাহী প্রচার করেন। দরবার হলে সভা বসত। সব ধর্মের ধর্মগুরুরা সেখানে উপস্থিত থাকতেন। আবুল ফজল, বীরবল প্রভৃতি মুষ্টিমেয় কয়েকজন এই ধর্মমত গ্রহণ করেন। বাদশাহ পাগড়ি ও আংটি দিয়ে শিষ্যদের গ্রহণ করতেন এই নতুন ধর্মে। জোরাষ্ট্রীয় ধর্মের প্রভাবে আকবরের সূর্য উপাসনার কথাও জানা যায়। ১৫৭৯ খৃস্টাব্দে এক আদেশ নামে ‘মহজর’ জারি করেন।

এর সার কথা, ইসলামী শরীয়তের ব্যাপারে উলামাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলে সেখানে বাদশাহের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত। ধর্মের উপর আকবরের আক্রমণে বাংলা-বিহারের মুসলিম প্রধানগণ শঙ্কিত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি কঠোর হাতে দমন করেন এই বিদ্রোহ। ঐতিহাসিকদের ভাষায় “দিল্লীশ্বরোবা জগদীশ্বরোবা” অর্থাৎ দিল্লীশ্বর তখন জগদীশ্বরের সমানাধিকারী।

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথম দিক। ভর্তি হয়েছি মাওলানা আজাদ (গভঃ) কলেজে। অজ পাড়া গাঁ হতে। এগারো ক্লাস পাশ করে। গায়ে কাদামাটির গন্ধ নিয়ে। পড়াচ্ছেন ইংরেজীতে ইতিহাস। তৎকালীন দিনে বাংলা ছাড়া সব বিষয়ই পড়ানো হত ইংরেজীতে। সব বোধে আসছে না। বুঝলাম তিনি বলছেন, ‘আল্লাহু আকবার’ মানে আকবরই আল্লাহ। (নাঊযুবিল্লাহ)

সভয়ে উঠে দাড়িয়ে বললাম, স্যার, তা নয়। আল্লাহু আকবার মানে আল্লাহ শ্রেষ্ঠ। তিনি পড়াচ্ছিলেন ঐতিহাসিকদের ভাষায় “দিল্লীশ্বরোবা জগদীশ্বরোবা” তার মানে তো তাই-ই হয়। হুমায়ূনের কবরের উপর নির্মিত সমাধি সৌধ দিল্লীতে, আকবরের কবরের উপর আগ্রার উপান্তে নির্মিত বিশাল সমাধি সৌধ সিকান্দ্রা (যে কবরের উপর পরবর্তী কালে জাঠেরা লাঠির বাড়ি মেরে প্রতিশোধ নিয়েছিল) এবং পরবর্তীতে মমতাজের কবরের উপর ২২ কোটি ব্যয়ে ২২ হাজার শ্রমিকের ২২ বছরের ফসল কবর কেন্দ্রিক তাজমহল –সবই স্বচক্ষে দেখেছিলাম সেদিন। আজও সেগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মহাকালের সাক্ষী হয়ে। আর জানান দিয়ে চলেছে বাদশাহদের প্রবর্তিত বিদ’আতের নিদর্শনের কথা আপামর জনগণের মধ্যে।

বাদশাহ-নবাবরা আজ আর কেউ নেই। সবাই চলে গেছেন। কিন্তু আজও যায় নি সেই শরীয়ত বিরোধী প্রথার প্রবাহগুলো। সেই প্রবাহ কিন্তু থামে নি। সমানে চলে আসছে। এ প্রবাহের রোধ দরকার। বহরমপুরে গোরাবাজার হাই স্কুলে শিক্ষকতার জীবনে একদিনের একটি ছুটির নোটিশ। বেরা উৎসবের ছুটি। সদ্য স্কুলে ঢুকেছি। সহ প্রধান শিক্ষক অপর্ণা ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন, বেরার ছুটি। বললাম সেটা কী উৎসব? বললেন, কী রকম মুসলিম, বেরার ছুটি জানে না। (ভারতের) লালবাগের হাজারদুয়ারীতে গঙ্গার উপর হালুয়া রুটি সমেত সোনার প্রদীপ ভাসানোর উৎসব। জানতাম না, আমার জানা হল। আজও আমাদের জেলার পাথর চাপুড়ীতে মাহবুব শাহের মাজারে সাজদাহ চলছে। মেয়েদেরকেও এলোচুলে সাজদা করতে দেখেছি।

আরও দেখুন:  ব্রিটিশ সম্রাজ্যের পাঁচ নিষ্ঠুরতা

দেখার জন্য সেথায় গিয়ে মনে হল, “লা তুশরিক বিল্লাহ্” আর “মুহদাসাতুন বিদ’আহ, বিদ’আতুন যালালা, যালালাতুন ফিন্নারে”– একথা গুলো কি মুসলিমদের বোধে আসে না। বিদ’আত আজ মুসলিম সমাজকে ঘিরে রেখেছে অক্টোপাসের মত। এ বাঁধন ছাড়াতে না পারলে যে মুক্তি নেই। যেতে হবে অধঃপতনের অতল তলে। ছাত্র জীবনে ঐতিহাসিক ভ্রমণে গিয়ে উত্তর ভারতের পথে প্রান্তরে যা স্বচক্ষে দেখেছি, যা গাইডের কাছে শুনেছি এবং যা ইতিহাস বইয়ে পড়েছি তার উপর ভিত্তি করেই এ লেখা। আমার নিজস্ব কথা নয়। আল্লাহ আমাকে, আমার পরিবারবর্গকে তথা সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে শিরক-বিদ’আত মুক্ত জিন্দেগী গুজরানের তাওফীক দিন। আর আমার এ লেখনী যদি কোনো ভাইকে (দ্বীনি দাওয়াতের কাজে লেগে) শিরক-বিদ’আত হতে এতটুকু নড়াতে পেরে থাকে তাহলে সওয়াবের হকদার করুন (আমীন)।

————
লেখক : মুহাম্মাদ জাকারিয়া
উৎস: মাসিক সরল পথ
সংগ্রহ: waytojannah.com

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

৩টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Back to top button