ইতিহাস

বাংলাদেশের প্রথম মসজিদ ও ইসলামের ক্রমবিকাশ

যদিও বলা হয়ে থাকে ১২০৩/১২০৪ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের পর থেকেই আমাদের দেশে মুসলমানদের বসতি শুরু হয়। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মন্তব্য, বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের অনেক আগেই বেশ কিছু  আরব বণিক চট্টগ্রামে ঘর-বসতি গড়ে তুলেছিলেন। আর বাংলার উপকূলে আরব বণিকদের পরিভ্রমণের তথ্য, সনদ্বীপের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাস ও বঙ্গোপসাগরের মেঘনার মোহনায়  আরবীয়, ইরানী ও আবিসিনীয় মুসলমানদের ব্যাপ্তী এবং ‘সাবত-ই-গাং’ থেকে ‘চট্টগ্রাম’ নামকরণের কারণে এখানে আরব উপস্থিতির প্রমাণ মিলে।
আবার এটাও সত্য, বখতিয়ারের পূর্বে বাংলায় মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। খলিফা হারুন অর-রশীদের আমলের একটি মুদ্রা (১৭৬ হিজরী/৭৮৮ খ্রিস্টাব্দ) রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে ধ্বংসস্তুূপের মধ্যে পাওয়া গেছে, কুমিল্লার  ময়নামতির ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও কিছু আরবীয় মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিকদের বক্তব্য, বাংলার বিভিন্ন স্থানে আরব বণিক বা ধর্ম প্রচারকদের পদধূলি পড়েছিল এবং তারাই খ্রিস্টীয় অষ্টম বা নবম শতকে তা এনে ছিলেন। যার কিছুটা আবিষ্কৃত হয়েছে, কিছুটা হয়তোবা অনাবিষ্কৃত রয়েই গেছে বা নিশ্চিহ্নও হয়ে গেছে। ভারতবর্ষে মুসলিম অবস্থানের প্রামাণ্যতার মূল ঐতিহাসিক উৎস ছয়টি যথা- (১) মুদ্রা (২) শিলালিপি (৩) স্মৃতিসৌধ, অট্টালিকা বা মসজিদ (৪) ঐতিহাসিক সাহিত্য (৫) রাজকীয় দলিলপত্র (৬) ভিনদেশী পর্যটকদের বিবরণ।
৬১৭ খ্রি. ১৪ রজব বৃহস্পতিবার প্রিয়নবীর (সা.) আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদ দু’ভাগ হতে দেখে ‘রাজাভোজ’ মুসলমান হয়ে আব্দুল্লাহ নাম ধারণ করেন এবং ইনিই ভারতীয় সর্বপ্রথম মুসলমান। এতে বোঝা যায় প্রিয়নবীর (সা.) জীবদ্দশায় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। অন্যদিকে বিবি খাদিজার (রা.) বাণিজ্যিক জাহাজ চট্টগ্রামে নোঙ্গর ফেলেছিল এবং দক্ষিণ আরবের ‘সাবা’ জাতি ঢাকার অদূরে বসতি গড়লে তার নাম হয়ে যায় সাভার। আবার সাহাবি, পীর দরবেশের দাওয়াতি মেহ্নতে এ অঞ্চলের মানুষ উন্নত গুণমানের মুসলমান। আমার পরম প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ‘জাতীয় অধ্যাপক’ দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফের মতে, হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে মা’মুন, মুহাইমেন (রা.) নামক সাহাবিদ্বয় বাংলাদেশে আগমন করেন। এছাড়া উপমহাদেশে আগত সাহাবিদের মধ্যে রয়েছেন- আব্দুল্লাহ্ বিন আব্দুল্লাহ্ ওতবান, আশইয়াম বিন আমর তামিমি, মা’মার তামিমি (রা.) প্রমুখ। অন্যদিকে বিশিষ্ট সাহাবি আবু ওয়াক্কাস (রা.) ৩য় হি. (৬২৬ খ্রি.) ইসলাম প্রচারের জন্য চীন যাওয়ার পথে কিছুকাল রংপুর এলাকায় অবস্থান করে ইসলাম প্রচার করেন। পরবর্তী সময়েও অসংখ্য পীর-দরবেশের পদস্পর্শে এদেশে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।  
বাংলাদেশের সমাজ মসজিদ ভিত্তিক এবং ইসলাম ও মুসলিম চেতনায় ‘মসজিদ স্থাপত্য’ কালের সাক্ষী হয়ে আছে। মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হয়, বাংলাদেশের রংপুরের ৪৮ কি.মি. দূরে লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের বড়বাড়িতে রামদাস মৌজার মসতার পাড় নামক স্থানে এক অভূতপূর্ব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে, যা ৬৯ হিজরিতে (আনুমানিক ৬৯২ খ্রি.)  নির্মিত একটি মসজিদ। এই মসতার পাড় স্থানটি বহুকাল ধরে ৭/৮টি উঁচু মাটির টিলা ও জঙ্গল দ্বারা আবৃত ছিল। যার স্থানীয় নাম ‘মজদের আড়া’। স্থানীয় ভাষায় ‘আড়া’ অর্থ জঙ্গলময় স্থান। এতোদিন কেউ হিংস্র জীব-জন্তু, সাপ-বিচ্ছুর ভয়ে ভেতরে প্রবেশ করতো না। ১৯৮৭ সালে জমির মালিক তা আবাদযোগ্য করার ব্যবস্থা করলে, জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে প্রাচীনকালের  তৈরি ইট, যাতে ছিল ফুল আঁকা। আর মাটি ও ইট সরাতে সরাতে পূর্ণ একটি মসজিদের ভিত খুঁজে পাওয়া গেল। এর মধ্যে ৬”দ্ধ ৬”দ্ধ ২” সাইজের একটি শিলালিপি পাওয়া যায়, যার মধ্যে স্পষ্টাক্ষারে আরবিতে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরি ৬৯ সাল। আরো খননের পর মসজিদের মেহরাব এবং মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ্ মাঠ ও ইমাম সাহেব যে স্থানে খুৎবা পাঠ করতেন, তাও আবিষ্কৃত হয়। তখন থেকেই এলাকার লোকজন এ স্থানে টিন দিয়ে একটি সাধারণ ছোটোখাট মসজিদ  তৈরি করে নামাজ পড়ে আসছেন। তারা  মসজিদটির নাম দিয়েছেন ‘হারানো মসজিদ’।
তাই এটা বলা যেতে পারে যে, আরব থেকে আগত মুসলমান- যারা ৬৯ হিজরিতে এ এলাকায় বসবাস করেছিলেন এবং নিজেদের ধর্মীয় প্রয়োজনে মসজিদও  তৈরি করে ছিলেন। ঐতিহাসিকদের জন্য মসজিদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, আরবদের সিন্ধু বিজয়সহ, পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম ঐতিহ্য বিশেষত, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এ আবিষ্কার। কারণ, এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো যে, শুধুমাত্র বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলেই প্রাচীনকালে আরবদের আগমন ঘটেছিল এবং তা খুব বেশি অতীত হলে খ্রিস্টীয় অষ্টম বা নবম শতকে। কিন্তু লালমনিরহাটে আবিষ্কৃত ৬৯ হিজরির (আনুমানিক ৬৯২ খ্রি.) ‘হারানো মসজিদ’ তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ নিয়ে সে ধারণাকে নতুনভাবে বিশ্লেষণের দাবি জানাচ্ছে। সত্য বলতে কী, অষ্টম হিজরীতে ক্যান্টন থেকে চীনের রাজা তাইশাং হযরত আবু কাবশার (রা.) মারফত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও সাহাবায়ে কিরাম ইসলামের আলো নিয়ে এসেছিলেন। গুজরাটের  রাজা ভোজের কাছে সাহাবায়ে কিরাম এসেছিলেন। ক্যারালার রাজা চেরুমল-পেরুমলও সাহাবাদের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কাজেই সেদিক থেকে বিচার করলে ৬৯ হিজরিতে বাংলাদেশে মসজিদ নির্মিত হওয়া বিচিত্র ঘটনা নয়।  
বস্তুত, মুসলিম ঐতিহ্যের জীবন্ত কিংবদন্তি বিভিন্ন দৃষ্টি নন্দন মসজিদ। যা কোন ধ্বংসাবশেষ নয় বরং তাওহীদি চেতনায় সমুজ্জ্বল ও মানব জাতির অহংকার। কেননা, প্রিয়নবী (সা.)  বলেছেন- কিয়ামতের কঠিন দিনে সাত শ্রেণির লোক মহান আল্লাহ্র ‘আরশের ছায়া’ লাভে ধন্য হবেন; যাদের অন্যতম ‘মসজিদ অন্তঃপ্রাণ’ অর্থাৎ যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে লেগে থাকে (বুখারি)।

আরও দেখুন:  আছহাবে কাহফ -এর শিক্ষা

———-
– আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
(ইনকিলাব)

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button