রামাযান ও ছিয়াম

রাসুল (সা.) যেভাবে রামযানের শেষ দশক কাটাতেন

মাহে রামযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী অংশ হলো শেষের দশ দিন। সারা বছরের অন্য যে-কোনো সময়ের চেয়ে ইবাদতের শ্রেষ্ঠ সময় এই দশক। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবনে অন্য কোনো সময় ইবাদত-বন্দেগিতে এত বেশি মশগুল হতেন না যতটা মশগুল থাকতেন এই দশকে। এই দশকের তাঁর ইবাদত-বন্দেগির বর্ণনা দিতে গিয়ে মুসলিমের এক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘রাসুল (সা.) রামযানের শেষ দশ দিনে ইবাদত-বন্দেগির জন্য যত অধিক-হারে পরিশ্রম করতেন, অন্য কোনো সময় তা করতেন না।’ অপর বর্ণনায় তিনি বলেছেন, ‘(রামযানের) শেষ দশক আরম্ভ হলে তিনি কোমর বেঁধে ইবাদতে নেমে পড়তেন এবং রাতভর বিনিদ্র থেকে আমলে মাশগুল থাকতেন ও পরিবারের সবাইকে জাগিয়ে দিতেন।’ বোখারি-মুসলিমের এক বর্ণনা মতে, তিনি আলী ও ফাতেমা (রা.) কে ডেকে বলতেন, তোমরা উঠবে না? (নফল) নামাজ পড়বে না? এ হাদিসের আলোকে রামযানের শেষ দশকে তাঁর তিনটি সুন্নতের কথা আমরা জানতে পারি। এক. রাত জেগে ইবাদত, দুই. ইবাদতের জন্য সবকিছু ত্যাগ করে সর্বাধিক পরিশ্রম, তিন. পরিবারের লোকদেরও ইবাদতের জন্য ডেকে তোলা। অথচ এ বিষয়ে আমাদের সমাজের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম দশকে আমরা কমবেশি আমল ও ইবাদতে নিমগ্ন হলেও শেষ দশকে গাফেল হয়ে যাই। ঈদের কেনাকাটা ও প্রস্তুতির ধুমে ইবাদতে মগ্ন হতে পারি না।

লাইলাতুল কদর অন্বেষণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) রামযানের শেষের দশ রাতে ‘লাইলাতুল কদর’ অন্বেষণ করতেন। লাইলাতুল কদরে ইবাদত-বন্দেগি করতে পারা হাজার মাস আল্লাহর ইবাদতে কাটানোর চেয়েও সৌভাগ্যের বিষয় এবং মর্যাদার বিচারে শ্রেষ্ঠ। লাইলাতুল কদর ঠিক কোন রাত? তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। উদ্দেশ্য, বান্দা যেন আল্লাহর প্রেম ও কল্যাণ কামনায় উজ্জীবিত হয়ে এই রাত অন্বেষণে ব্যাকুল থাকে। নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রামযানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোয় কদরের রাত তালাশ করো।’ অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনা থেকে ২৭তম রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার জোরালো সম্ভাবনার কথা বর্ণিত আছে। তবু যে ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে লাইলাতুল কদরে ইবাদতের মর্যাদা পেতে চায়, তাকে শেষ দশকের প্রতিটি রাতে সম্ভব না হলে কমপক্ষে সব বেজোড় রাতে ইবাদত করতে হবে। নবী (সা.) তাই করতেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলেছিলেন, আমি যদি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই। অর্থাৎ কোনো রাত আমার কাছে লাইলাতুল কদর মনে হয়, তাহলে কোন দোয়া পাঠ করব? তখন নবী (সা.) বলেছেন, তুমি পড়বেÑ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুুল আফওয়া ফাফু আন্না।’ অর্থ ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিজি)।

আরও দেখুন:  শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা: সারা বছর রোযার ছোয়াব পাওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ

ইতিকাফ নবীজীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া একটি আমল

রামযানুল কারিমের শেষ দশক যেহেতু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এই দশকেই অবস্থিত হাজার বছরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ রজনি লাইলাতুল কদর, সেজন্য এই দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যসব ব্যস্ততা ও কাজকর্ম ছেড়ে আল্লাহর ঘরে এসে বসে পড়তেন। এটা ছিল তাঁর আজীবনের নিয়ম। উদ্দেশ্য, লাইলাতুল কদর অন্বেষণ এবং একান্তে আল্লাহর ইবাদতে কাটানো। আয়েশা (রা.) বলেছেন, নবী করিম (সা.) আজীবন প্রতি বছর রামযানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন। (এরপর তাঁর সহধর্মিণীরাও এই দশকে) ইতিকাফ করতেন। (বোখারি)। বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইতিকাফ কিছুটা কষ্টকর ইবাদত মনে হলেও এটি অত্যন্ত প্রেমময় একটি আমল। ইতিকাফকারী ব্যক্তি আল্লাহর ঘরে অবস্থানের কারণে যেন আল্লাহর মেহমানে রূপান্তরিত হয়। আক্ষেপ, যে আমলটি আল্লাহর রাসুল (সা.) জীবনে একবারও ছাড়েননি, সেটা আমরা বেশিরভাগ লোক জীবনে একবারও করিনি! ইতিকাফকারীকে ২০তম রামযানে সন্ধ্যার আগ থেকে ঈদের  চাঁদ ওঠা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করতে হবে। এই সময়ে অনন্যোপায় না হলে মসজিদ থেকে বের হওয়া নিষেধ। ইতিকাফ অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া অবশিষ্ট সময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও দোয়ায় মশগুল থাকতে হবে।

রামযানের শেষ ও সম্পূরক আমল ফিতরা

রামযানের শেষ দশকের শেষ দিনের আমল ছিল সদকাতুল ফিতরা আদায়ের প্রস্তুতি। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনায় যেসব ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে থাকে তা থেকে সিয়ামকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য সব রোজাদারকে জাকাতুল ফিতর আদায়ের নির্দেশ করেছেন আল্লাহর রাসুল (সা.)। সেই সঙ্গে অভাবী মানুষও যেন ঈদ আনন্দে শামিল হতে পারে, সেটিও ছিল তাঁর ফিতরা ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদ্দেশ্য। সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাদারের জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় অপরিহার্য করে দিয়েছেন। অনর্থক কথা ও কাজ থেকে রোজাদারের রোজাকে পরিশুদ্ধ করা এবং অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা করা এই বিধানের উদ্দেশ্য।’ সব সামর্থ্যবান রোজাদার তার ও তার পরিবারের ছোট-বড় সব সদস্যের পক্ষ থেকে জাকাতুল ফিতর আদায় করবেন। ওই হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি তা (ফিতরা) ঈদের নামাজের আগে আদায় করবে তা গৃহীত হবে এবং যে ব্যক্তি ঈদের পর আদায় করবে তা সাধারণ দান হিসেবে গণ্য হবে (ফলে তার ফিতরা আদায় হবে না)।’

আরও দেখুন:  পবিত্র রামাযান : আল্লাহর সান্নিধ্যে ফিরে আসার মাস

– আহমাদ উল্লাহ

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button