হজ্জ ও ওমরাহ

মক্কার কবরস্থান আল-মু‘আল্লা

মু‘আল্লা কবরস্থানের পরিচয়:

এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকেই মক্কাবাসীদের প্রধান কবরস্থান। মসজিদে হারামের ৭০০ মি. দূরত্বে আল-হুজুন এলাকায় অবস্থিত। তার আয়তন ২১০০.০০০ মিটার।

মক্কাবাসীদের হাজার হাজার মৃতসহ সেখানে পার্শ্ববর্তী ও মুসাফিরদেরও দাফন করা হয়। অনুরূপ দাফন করা হয়েছে সেখানে কিছু সংখ্যক সাহাবীকে।

মু‘আল্লা কবরস্থানের ফযীলত:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: نِعْمَ الْمَقْبُرَةُ هَذِهِ “কতইনা উত্তম কবরস্থান এটি”। এ হাদীসটি ব্যতীত মুয়াল্লা কবরস্থানের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস নেই।[1]

পক্ষান্তরে এ ব্যতীত যা কিছু পাওয়া যায়, যেমন সেখান থেকে সত্তর হাজার পুনরুত্থান হয়ে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যাদের প্রত্যেকেই আবার সত্তর জনের জন্য সুপারিশ করতে পারবে। এর কোনো কিছুই সঠিক সূত্রে সাব্যস্ত নয়।[2]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে নিয়ে হজ করেছেন; কিন্তু তাদের কেউ সেখানে সালাত বা দো‘আর জন্য গমন করেন নি। যারা সে সব কবরস্থান যিয়ারত করেছেন তারা তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে হুকুম দিয়েছেন সেই শরী‘আতসম্মত পদ্ধতিতেই যিয়ারত করেছেন। সুতরাং তারা কবরবাসীকে সালাম প্রদান করেছেন ও তাদের জন্য দো‘আ করেছেন। সালাফে সালেহীনের কারো থেকে এমন বর্ণিত হয় নি যে, তিনি সেখানে দো‘আর জন্য গিয়েছেন; বরং যা কিছু বর্তমানে সেখানে ঘটে থাকে তা পরবর্তী যুগ সমূহেরই সৃষ্টি।

মু‘আল্লা কবরস্থান যিয়ারত করার শরী‘আতসম্মত বিধান ও যিয়ারতকারী সেখানে যা বলবে

প্রত্যেক স্থানের কবর যিয়ারতই শরী‘আতসম্মত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«زُورُوا الْقُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ»

“তোমরা কবর যিয়ারত কর, কেননা তা তোমাদের মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দিবে।”[3]

মক্কায় যে সকল পুরুষ অবস্থান করে তাদের জন্য শরী‘আতসম্মত হলো, মক্কার অন্যান্য কবরস্থানের মতোই আল-মু‘আল্লা কবরস্থান যিয়ারত করা।

পক্ষান্তরে মহিলাদের জন্য সঠিক মতানুযায়ী কবর যিয়ারত শরী‘আতসম্মত নয়। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«لَعَنَ اللَّهُ زَوَّارَاتِ الْقُبُورِ»

“আল্লাহ তা‘আলা বেশি কবর যিয়ারতকারী মহিলার প্রতি লা‘নত করুন।”[4]

কবর যিয়ারতের হাদীসগুলো দ্বারা যিয়ারতের ব্যাপারে স্পষ্ট হয় যে, কবর যিয়ারতের দ্বারা মুসলিম তিনটি উপকার পেয়ে থাকে:

(১) কবর দেখে মৃত্যুকে স্মরণ হয়, তাতে মুসলিমগণ যেন সৎ আমল করে এ কবরের জন্য প্রস্তুতি নেয়। আর এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

«فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الآخِرَةَ»

“সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত কর, কেননা তা পরকালকে স্মরণ করিয়ে দিবে।”[5]

(২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ। কেননা কবর যিয়ারত একটি সুন্নাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করেছেন। সুতরাং মুসলিমগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে কবর যিয়ারতের মাধ্যমে সাওয়াব অর্জন করবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুমে সাড়া দেয়ারও সাওয়াব অর্জন করবে। যেমন, তিনি বলেন, زُورُوهَا অর্থাৎ তোমরা কবর যিয়ারত কর।

আরও দেখুন:  মায়মূনা কবরস্থান যিয়ারতের হুকুম

(৩) তার মুসলিম ভাইদের জন্য দো‘আ করে তাদের প্রতি ইহসান ও সহানুভূতি প্রদর্শন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহভাবে যিয়ারতের যে সব দো‘আর শব্দমালা সাব্যস্ত হয়েছে ও তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তাতে মুসলিমদের মৃতদের জন্য দো‘আ যুক্ত রয়েছে, যা তাদের জন্য উপকারী এবং তারা ইনশাআল্লাহ তা থেকে উপকৃত হবেন। আর কবর যিয়ারতকারী তার ভাইয়ের জন্য দো‘আ ও তাদের প্রতি ইহসান করার সাওয়াব অর্জন করবে।

মুসলিম যখন কবরস্থান যিয়ারত করবে, তার উচিৎ সে যেন শরী‘আতসম্মত বৈধ সীমায় অবস্থান করে তা যিয়ারত করে। সুতরাং সে মৃতের জন্য শরী‘আতে বর্ণিত দো‘আ দ্বারাই যিয়ারত করবে। অতএব সে বলবে:

«السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَإِنَّا، إِنْ شَاءَ اللهُ لَلَاحِقُونَ،وَيَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ، أَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ»

“হে মুমিন-মুসলিম কবরবাসীগণ, আপনাদের প্রতি সালাম, নিশ্চয় আমরাও ইনশাআল্লাহ আপনাদের সাথে মিলিত হব। আপনারা যারা অগ্রগামী হয়েছেন ও যারা পরবর্তীতে আসবেন, আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করুন! আমরা আমাদের ও আপনাদের জন্য নিরাপত্তা চাই।”[6]

উল্লিখিত শব্দমালায় মৃতের জন্য দো‘আ এসেছে।

মু‘আল্লায় কবরস্থ কারো কারো স্থান নির্ধারণ সম্পর্কিত বিষয়

এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে মু‘আল্লা হল, মক্কাবাসীদের কবরস্থান। সেখানে কিছু সংখ্যক সাহাবীকে দাফন করা হয়েছে। সর্বজনবিদিত যে, ইসলামী শরী‘আত কোনো কবরকে চিনে তাকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিতে উৎসাহিত করে নি; বরং শরী‘আত কোনো আলামত দ্বারা চিহ্নিত করার মাত্র অনুমতি দিয়েছে, যেমন পাথর দ্বারা চিহ্নিত করা। তবে তাতে নির্মাণ কার্য করা, তার উপর লেখা-লেখি করা নিষেধ। যেমন, জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে আছে, তিনি বলেন,

«سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى أَنْ يَقْعُدَ عَلَى الْقَبْرِ، وَأَنْ يُقَصَّصَ وَيُبْنَى عَلَيْهِ أَوْ أَنْ يُكْتَبَ عَلَيْهِ، أَوْ يُزَادَ عَلَيْهِ»

“রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি কবরে বসতে, কবরে নির্মাণ কাজ করতে, প্লাস্টার করতে ও তার উপর লিখতে নিষেধ করতে শুনেছি।”[7]

উল্লিখিত আলামত স্থাপনের যে অর্থ বুঝায়, তা অবশ্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে; কিছুকাল অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর। কেননা কবর চেনা-জানার ব্যাপারে শরী‘আতের কোনো বিধি-বিধানের সম্পর্ক নেই। এ জন্যই মু‘আল্লা কবরস্থানের চিহ্নগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তাই নিশ্চিতভাবে তা চেনা বা জানা যায় না।

আরও দেখুন:  মক্কা-মদীনায় প্রসিদ্ধ স্থান সমূহ

ইবন জুবায়ের তার ৫৭৮ সনের ভ্রমনে মু‘আল্লা কবরস্থান সম্পর্কে বলেন: উল্লিখিত কবরস্থানটি একদল সাহাবী, তাবে‘ঈ, ওলী ও সৎলোকের দাফনস্থল। তার লক্ষ্যস্থলগুলো বিলুপ্ত হয়েছে এবং শহরবাসী হতে তাদের নামও মিটে গেছে।

অতঃপর তিনি কিছু সংখ্যক আলিম থেকে কতিপয় দলীল বর্ণনা করেন। তারপর বলেন: এগুলোই কতিপয় আলিম থেকে জানা দলীল। এসবই যেমন দেখছেন বিবেকসম্মত কথা। এর স্বীকৃতি ব্যতীত অস্বীকার করার কোনো পথ নেই, যে কতিপয় সাহাবী, তাবে‘ঈ ও তাদের পরবর্তীতে বড়-বড় আলিম ও সৎ ব্যক্তি যাদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়, তারা সেই মক্কা কবরস্থানে দাফন হয়ে রয়েছেন; কিন্তু সঠিকভাবে তাদের কবরগুলোকে আমরা নির্ধারণ করতে পারব না। আর তাদের কবর চেনা বা না চেনাতে কোনো উপকার বা অপকারও অর্জন হবে না; বরং তাদের জন্য আমাদের পক্ষ হতে দো‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনাই তাদের নিকট পৌঁছবে, তারা ভূ-খণ্ডের প্রাচ্যেই থাকুন আর প্রাশ্চ্যত্যেই থাকুন।

কোনো কোনো যিয়ারতকারী যেসব সুন্নাত পরিপন্থী বিষয়ে লিপ্ত হয়

কবর যিয়ারতকারীর উচিত, সে যেন তার যিয়ারতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতী পদ্ধতি পালন করে এবং সে সব বিষয়ে পতিত হওয়া থেকে সতর্ক হয় যা হবে সুন্নাত পরিপন্থী ও তাকে তা গুনাহে নিপতিত করবে, বা তার নেকী কমে যাবে। নিম্নে এমন কতিপয় শরী‘আত পরিপন্থী বিষয় উল্লেখ করা হল যাতে কোনো কোনো যিয়ারতকারী পতিত হয়ে থাকে। যেন যিয়ারতকারীগণ সেগুলোতে পতিত হওয়া থেকে বাঁচতে পারে:

১। কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের উসীলা করা, তাদের নিকট ফরিয়াদ করা ও তাদের নিকট সুপারিশ তলব করা।

২।  কবরের সম্মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করা ও এমন বিশ্বাসে নীরবতা পালন করা যে, এমন করা শরী‘আত নির্দেশিত আদবের অন্তর্ভুক্ত। এসব হলো, বাড়াবাড়ি ও কবরবাসীদের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা। কবরবাসীর সাথে এমন করা শির্কের উসীলা ও মাধ্যম।

৩।  কবরবাসীর জন্য সিজদা ও রুকু করা, অথচ সাজদাহ ও রুকু ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তা আল্লাহ ব্যতীত কারো জন্য করা জয়েয নয়।

৪।  কবরস্থানের ভিতরে-বাইরে কবুতরের জন্য এমন বিশ্বাস শস্য দানা নিক্ষেপ করা যে, তাতে রয়েছে নেকী ও প্রতিদান। বিশেষ করে তা কবুতরকে খাওয়ানোর মধ্যে বা তাতে বরকত রয়েছে এমন বিশ্বাস পোষণ। এমন কর্ম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেন নি, না কোনো সাহাবা করেছেন আর না কোনো তাবে‘ঈ বা সালাফে সালেহীন করেছেন। সুতরাং তা হলো দীনের মধ্যে নব আবিস্কৃত বিদ‘আত। অনুরূপ এতে খাদ্যের অবমাননা ও পথিককে কষ্ট দেওয়া হয়।

আরও দেখুন:  হজ্জের পরে হাজীদের করণীয়

৫।  সেখানে উচ্চস্বরে বিলাপ করা, মুখে মারা বা গাল চাপড়ানো ইত্যাদি। আর সর্বজনবিদিত কথা যে, এসব কর্ম হারাম; বরং কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।[8]

৬।  নামাযে কবরকে সামনে করা এবং এ সালাতকে “সালাতে যিয়ারা” নামকরণ করা অথচ কবরের দিকে সালাত আদায় উলামায়ে কিরামের ঐকমত্যে হারাম।

৭।  সম্মিলিতভাবে সেখানে দো‘আ ও যিকির করা, অথচ তা এমন আমল যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেন নি, না করেছেন তাঁর সাহাবাগণ, না তাবে‘ঈগণ।

৮।  কবর হতে চুম্বন-স্পর্শ করার জন্য বা বরকত বা রোগ মুক্তি কামনায় অন্য কিছুর সাথে মিশানোর জন্য মাটি গ্রহণ করা।

৯।  কবরবাসীকে নিজের হাজত পূরণ ও তাদের দ্বারা বালা-মুসীবত দূর করার জন্য বিভিন্ন ম্যাসেজ প্রদান করা।

১০। কবরের সাথে বরকত হাসিলের জন্য সুতা ও নেকড়া প্যাঁচানো এবং দরজা ও জানালায় তালা লাগান।

১১। অনুরূপ বরকত গ্রহণের জন্য কবরস্থানের দেয়াল, দরজা ও তার মধ্যে যে জিনিস রয়েছে তা স্পর্শ করা।

১২। কোনো কোনো কবরে পয়সা দেওয়া; অথচ তা হলো, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে মান্নতের অন্তর্ভুক্ত।

১৩। ফাতেহাখানী, কুলখানী, সূরা ইয়াসীন ও সূরা বাকারার শেষ দু’ আয়াত পাঠ করে মৃতের রূহের জন্য বখশে দেওয়া।

১৪। বরকত গ্রহণের আশায় নখ, চুল, দাঁত কবরে পুঁতে রাখা।

১৫। কবরবাসীর নৈকট্য অর্জনের জন্য কবরে আতর, গোলাপ জল ছিটানো। অথচ এটি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নৈকট্য অর্জন করার অন্তর্ভুক্ত যা হারাম জায়েয নয়।

অনুবাদক: মুহাম্মাদ আব্দুর রব আফ্ফান


[1] হাদীসটি ইমাম আহমদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেন: ১/৩৬৭; ইমাম বুখারী, তারীখে কাবীর: ১/২৮৪ ও প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

[2] শাইখ গাব্বান রচিত ফাযায়েলে মক্কা: ২/৯৪৩-৯৪৪।

[3] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৭৬।

[4] আবু দাউদ ত্বায়ালিসী, হাদীস নং ২৪৭৮।

[5] তিরমিযী, হাদীস নং ১০৫৪

[6] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৯৭৪, ৯৭৫।

[7] আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩৩২৫, ৩২২৬, তিরমিযী, হাদীস নং ১০৫২, নাসাঈ, হাদীস নং ২০২৭; হাকেম: ১/৫২৫ তিনি সহীহ বলেছেন।

[8] আল-মাক্কীর আযযাওয়াজের: ১/৩০৬

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button