স্বাস্থ্য তথ্য

“এনার্জি ড্রিংক’স”! নিয়মিত পান করছেন তো?

বাংলাদেশে ২০০৯ সালের ১০ মে শার্ক এনার্জি ড্রিংক’স বাজারে আনা হয়। সম্ভবত এটাই এদেশের প্রথম এনার্জি ড্রিংক’স। এরপর একে একে নায়ক, গায়ক থেকে শুরু করে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সবাই নাকি এনার্জির জন্য পান করেন এনার্জি ড্রিংক’স। বিজ্ঞাপনে সাকিব আল হাসান তো বলছেন-ই, “রয়েল টাইগার” আমার এনার্জির পার্টনার। আসুন জেনে নেই অন্যান্য বিজ্ঞাপন বার্তা গুলো আমাদের কে কি বলছে-

ব্ল্যাক হর্স- “গায়ক জেমস বলছেন- হাতের মুঠোয় আছে জীবনের স্বাদ, তাজা ভালোবাসা- তাজা প্রতিবাদ, চলে এসো বন্ধুরা মেতে উঠি ফে্ মুছে নিই কতটা এক চুমুকের ব্ল্যাক হর্স দিয়ে। নিস্ফল হতাশা যাক ধুয়ে মুছে, অভিমানী মন জাগে সাফল্য নিয়ে। ব্ল্যাক হর্স সোর্স অফ পাওয়ার।“

পাওয়ার-“সবাই আমাকে চেনো, সবাই আমাকে জানো, আমার পাওয়ার এর খবর কি কেউ রাখো। পাওয়ার পাওয়ার শাকিবের পাওয়ার। হিংসা করিনা পাওয়ার এর কারনে। আসুক ঝড় তুফান উড়ে যাবে পাওয়ার এ”।

রয়েল টাইগার নিয়ে আইয়ুব বাচ্চু’র গান- এসো সবাই মিলে গাই গান, ভরে যাক এই প্রাণ।অন্তর জুড়ে সবার মন চায় বারে বার টাইগার-টাইগার। রিচার্জ ইয়োরসেলফ”।

২০টাকায় ঢাকা যাওয়ার এক বিজ্ঞাপনে বলা হয়, শার্ক খেলে এমন এনার্জি পাবেন যে ধরা কে সরা জ্ঞান করবেন। রাশ এনার্জি ড্রিংক’স খেলে তো আপনি পাটুরিয়া থেকে সাতরিয়ে বাহামাস যেতে পারবেন। বলা হছে রাশ-“মানুষ না মেশিন”(২০১৪)।

এভাবেই গল্পটা এগিয়ে চলে। একাধিক তারকাখচিত বিজ্ঞাপন-ই শুধু নয় আরো বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় বিজ্ঞাপনের তালিকায় রয়েছে, স্পিড এনার্জি ড্রিংক’স এর ছায়া ধরার বিজ্ঞাপন কিংবা রয়েল এনার্জি ড্রিংক’স এর মাকড়সা দেখে ভীত এক মেয়ের হেল্প চাওয়া বিজ্ঞাপন তো সবারই দেখা।

২০-৩০ টাকা দামের এইসব এনার্জি ড্রিংকসের ভোক্তা ১২ থেকে ৪০ বছরের অনেকেই। তীব্র ঝাঝালো গন্ধ প্রায় সব মুদি দোকানেই নিজের সগৌরব উপস্থিতি জানান দেয়। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার কারন কি?

শুরুতেই এনার্জি ড্রিংক’স ফেনসিডিল সদৃশ্য বোতলে বাজারজাত করে ক্রেতা সাধারনের দৃষ্টি আকর্ষন করা হয়। বিজ্ঞাপনের নানা গুনগান আর সাথে নিষিদ্ধ “এ্যালকোহোল” গ্রহনের প্রতি তরুন সমাজের দূর্নিবার আকর্ষন। এখন পরিচিত এইসব পানীয় আবার কালারফুল ক্যান-এ এই পানীয় বাজারজাত করা হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত বাজারও উল্লেখযোগ্য কারন গুলোর একটি ।

আরও দেখুন:  অ্যালার্জি হ’লে করণীয়

এদেশের বাজারে প্রচলিত ৩৫ থেকে ৪০ জাতের এনার্জি ড্রিংক’স এর মধ্যে রয়েছে-

স্পিড, পাওয়ার, ব্ল্যাক হর্স, স্টিং, রয়েল টাইগার, বার্বিক্যান, পিওর হেভেন, ওলিটালিয়া, টেস্কোবেরিমিক্সড, মসি, থ্রি হর্স, লোটিসেক্সাফ্রাফ, আপেল ড্রিঙ্কস, রেড বুল, হার্সিজ সিরাপ, রয়েল ডাচ, জলিন্টার ব্লুবেরি, ব্লে ট্রি, ভিগো বি, হর্স ফিলিংস, ফিলিংস, ফুওয়াং ড্রিঙ্কস, সার্ক, ক্রাউন, বিগ বস, ম্যান পাওয়ার, হর্স পাওয়ার, জিংসিং, রেড ওয়াইন।

এবার জেনে নেয়া যাক এসব পানীয়তে কি কি উপাদান ব্যবহার করা হয়-

স্পিড

সোডিয়াম বেনজোয়েট ১৮৯.৫৪ মিলি গ্রাম

ক্যাফেইন টক্সিক ৫০৬.৪৩ মিলিগ্রাম

স্যাকারিন সহনীয় মাত্রা

পাওয়ার

সোডিয়াম বেনজোয়েট ১৭৯.৮৪ মিলি গ্রাম

ক্যাফেইন ৩৮২.৭১ মিলি গ্রাম

স্যাকারিন ৮.৬৯ মিলি গ্রাম

স্টিং

সোডিয়াম বেনজোয়েট ১৪৯.০৪ মিলিগ্রাম

ক্যাফেইন ৪৬.২৬ মিলি গ্রাম

জিংসিং

সোডিয়াম বেনজোয়েট ৪৮৩১.৯৯ মিলিগ্রাম

ক্যাফেইন তেমন নেই

স্যাকারিন ৪৬৩.২৯ মিলিগ্রাম

ব্ল্যাক হর্স

সোডিয়াম বেনজোয়েট ১১৯.৭২

ক্যাফেইন ৩৫২.৬৮ মিলি গ্রাম

স্যাকারিন ৪,৩৫ মিলি গ্রাম

তাছাড়া এগুলোর কোন কোনটিতে ইথানল, সোডিয়াম সাইট্রেট, সাইট্রিক এসিড ব্যবহার করা হয়। (বিভিন্ন পানীয়তে ব্যবহৃত এসব উপাদানের পরিমান বিএসটিআই এর গবেষণায় পাওয়া গেছে।)

বাংলাদেশের আইন অনুসারে বিডিএস ১১২৩ এর ধারা বলে বিশ্বব্যাপী ক্যাফেইনকে কালো তালিকাভুক্ত করার পর বিডিএস লিটার প্রতি কোমল পানীয়ে ১৪৫ মিলি গ্রামের বেশি ক্যাফেইন মেশানো নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে পার্শ্ববতী ভারতে প্রতি লিটার সফট ড্রিঙ্কসে ১৪৫ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন মেশানো হয়, ইংল্যান্ডে ১৩০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন মেশানো হয়। ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২ অনুসারে কোন কোমল পানীয়ে যৌন উত্তেজক রাসায়নিক পদার্থ অপিয়েট অ সিলড্রেনাফিল সাইট্রেট ব্যবহার নিষীদ্ধ থাকলেও উপরে বর্ণিত বেশিরভাগ কোমল পানীয়ে অতি উচ্চমাত্রায় এসব রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩ এর অধীনে ‘নিরাপদ খাদ্যের উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে বলা আছে যে, (খাদ্যদ্রব্য জব্দকরণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ পদ্ধতি) খাদ্য দ্রব্যে বিষাক্ত উপাদান (ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম, সাইক্লামেট, ডিডিটি, পিসিবি ইত্যাদি), তেজষ্ক্রিয় ও ভারী ধাতুর ব্যবহার, ভেজাল খাদ্য বা খাদ্যোপকরণ উৎপাদন, আমদানি, বিপণন, নিন্মমানের খাদ্য উৎপাদন, অনুমোদন বিহীন, খাদ্য সংযোজন দ্রব্য বা প্রক্রিয়াকরণ সহায়ক দ্রব্যেও ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য আমদানি, মজুদ, সরবরাহ বা বিক্রয়, অনুমোদিত মাত্রার বাইরে বৃদ্ধি প্রবর্ধক, কীটনাশক, বালাইনাশক বা ঔষধের অবশিষ্টাংশ, অনুজীব ইত্যাদির ব্যবহার, অনুমোদন বিহীন বংশগতি বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনকৃত খাদ্য, জৈব খাদ্য, অভিনব খাদ্য ইত্যাদির উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

আরও দেখুন:  গরমে হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতে করণীয়

অপরপক্ষে ক্যাফেইন ব্যবহারের মাত্রা বিএসটিআই নির্ধারিত লিটারপ্রতি ১৪৫ মিলিগ্রাম করার কথা থাকলেও এর পুরোটাই আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। বেশিরভাগ কোমল পানীয়ে ক্যাফেইনের উচ্চমাত্রা যেমন ব্ল্যাক হর্সে পাওয়া গেছে ৩৫২.৬৮ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন মানব শরীরের জন্য যেমন দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির কারণ অন্যদিকে এসব কোমল পানীয়ে ক্যাফেইনের উচ্চমাত্রার কারণে অনেকেই নেশা হিসেবে এগুলো খাচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার আইনে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে যে একজন ক্রেতা বা ভোক্তা কি গ্রহণ করছে সে ব্যাপারে শত ভাগ জানার অধিকার তার আছে। কিন্তু এনার্জি ড্রিংক’স গ্রহণের ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন স্পিডে মিশ্রিত উপাদানের ব্যাপারে বোতলের গায়ে যথাযথভাবে উল্লেখ থাকেনা। থাকেনা কোন সতর্কবার্তাও । যেমনটি থাকে সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে। যদিও সেটা মানব শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ভোক্তা অধিকারে আরো উল্লেখ আছে জেনে শুনে কেউ বিষ পান করলেও কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোন দায়বদ্ধ থাকেনা। কিন্তু কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের নির্দিষ্ট দ্রব্যে ক্ষতিকর কোন কিছু ব্যবহার করার পর পণ্যের গায়ে এগুলো উল্লেখ না করাটা আইনত অপরাধ। আবার অনেক কোম্পানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা ভুয়া লেবেল লাগিয়ে উৎপাদন করছে এসব কোমল পানীয়। যেগুলোতে রয়েছে অতিউচ্চমাত্রার ক্যাফেইন ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ। বিএসটিআইয়ের ভুয়া লেবেল লাগিয়ে বাজারে বিক্রি হওয়া ২৭টি ব্র্যান্ডের এনার্জি ড্রিংকসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাসায়নিক পরীক্ষায় যেসব পানীয়তে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন, অ্যালকোহলসহ ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- খুলনার জেডএম এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘ডাবল হর্স’, পাবনার ইন্ট্রা ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউএন) লিমিটেডের ‘জিনসিন প্লাস’, কুমিল্লার চান্দিনার জাহান ফুড প্রোডাক্টের ‘মাশরুম’ ও ‘জাহান মাশরুম গোল্ড’, গাজীপুরের সততা এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের ‘জিসনিস পাওয়ার’, সাভারের এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘জিন্টার’, ঢাকার তনু নিউট্রিশন ফুড অ্যান্ড কসমেটিকস প্রোডাক্টের ‘তনু লায়ন ফ্রুট সিরাপ’, বগুড়ার উত্তরা ল্যাবরেটরিজের ‘জিনসিন’, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘ওয়াইল্ড ব্রিউ’, ঢাকার থ্রি স্টার ইউনানী ল্যাবরেটরিজের ‘জিন্টার প্লাস জিনসিন’ ও ‘জিনসিন’। গাজীপুরের পুবাইলের বিএনসি এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘হর্স ফিলিংস’, স্নেহা ফুড অ্যান্ড হার্বাল প্রোডাক্টের ‘কোরিয়ান রেড জিনসিং’, ঢাকার রানা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘হাই পাওয়ার ফিলিংস’, সাভারের আসিফ এগ্রো ফুড ও বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘সেভেন হর্স ফিলিংস’, ঢাকার থ্রি স্টার ইউনানী ল্যাবরেটরিজের ‘জিন্টার প্লাস জিনসিন’, দুবাইয়ের ‘ব্রাবিকান’, ‘রেডবাল’, জার্মানির ‘ওটিনজার’, ফ্রান্সের ‘হলসটিন’, থাইল্যান্ডের ‘সিঙ্গা’, অস্ট্রেলিয়ার ‘পাওয়ার হর্স’, হল্যান্ডের ‘রয়েল ডাচ’, ‘ব্রাভারিয়া’ ও ‘থ্রি-হর্সেস’।

আরও দেখুন:  ভুমিষ্ট বাচ্চার মুখে এক ডোজ মিষ্টি চিনির জেল দিলে সেটা বাচ্চাকে Brain Damge এর হাত থেকে রক্ষা করে

ফলের সিরাপ, কার্বনেটেড বেভারেজসহ কম ক্ষতিকর উপাদানসমৃদ্ধ পানীয় উৎপাদনের জন্য বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স (বিডিএস ১১২৩:২০০৭) নিয়ে প্রতারণামূলক ও কর ফাঁকি দিয়ে ক্যাফেইন, ভায়াগ্রামিশ্রিত এনার্জি ড্রিংকস তৈরি হচ্ছে আরও সাতটি ব্র্যান্ডের বেলায়। এগুলো হলো ঢাকার তনু নিউট্রিশন ফুড অ্যান্ড কসমেটিকস প্রোডাক্টের ‘তনু লায়ন ফ্রুট সিরাপ, বনানীর ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেডের ‘ফু-ওয়াং’, গ্লোব সফট ড্রিংকস নোয়াখালীর ‘রয়েল এনার্জি ড্রিংকস’ ও ‘ব্ল্যাক হর্স’, ধামরাই ঢাকার আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘স্পিড’, গাজীপুরের ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেডের ‘পাওয়ার’।

বিএসটিআই, ঔষধ প্রশাসনকে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতারণামূলক ভাবে নাম লিখিয়ে দেশীয় ব্র্যান্ডের ১০টি এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলো হলো থাইল্যান্ডের ‘সিঙ্গা’, অস্ট্রেলিয়ার ‘পাওয়ার হর্স’, আয়ুর্বেদীয় ফার্মেসি (ঢাকা) লিমিটেডের ‘স্ট্রং-৫০০’ (ইংরেজি ও বাংলা লেবেল), সেফ ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘ট্রিপ-অন’, ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেডের ‘ফু-ওয়াং’, চাঁদপুরের এশিয়া এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ‘হর্স ফিলিংস’, গাজীপুরের গ্লোবাল বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেডের ‘এপি ফিজ’ ও দুবাইয়ের ‘রেডবুল’।

বিএসটিআই এর দাবী- মানহীন এনার্জি ড্রিংকস কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। তা চলুক। চলতে থাকুক….

কি খাবেন আর কি খাবেননা সেটা একান্ত-ই আপনার সিদ্ধান্ত। তবে আপনার সুস্থতাই, আমাদের কাম্য।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button