পাষাণ হৃদয়

পৃথিবীর এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে অধিকাংশ মানুষই নিজের স্বার্থ ও লাভ-লোকসানের চিন্তা করে। এ লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে গিয়ে কখনও সে নিজের স্বজনকে ত্যাগ করে কিংবা আপনজনকে হত্যাও করে ফেলে। স্বার্থান্ধ মানুষ কেবল নিজের দিকটাকে বড় করে দেখে; অপরের বিষয়টা ভাবে না। অথচ মানুষ হিসাবে একে অন্যের জন্য কাজ করার কথা, পরস্পরের জন্য ত্যাগ করার কথা, নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও পরোপকারে আত্মনিয়োগ করার কথা। কিন্তু স্বার্থান্ধ মানুষের কাছে এসব কেবল নীতিবাক্য। এসব বলার কথা, শোনার কথা, মানার জন্য নয়। মানুষ এগুলি আমল করলে এ সমাজ সুন্দর সমাজে পরিণত হ’ত। অথচ স্বার্থপরতা মানুষকে পাষাণ হৃদয় করে ফেলে। মানুষের স্বাভাবিক মানবতা তার মধ্যে থাকে না। শত প্রচেষ্টায়ও তার হৃদয়ের কঠিন পাথরকে নরম করা যায় না; তার মন গলানো যায় না। এখানে পাষাণ হৃদয় সম্পর্কে একটি গল্প বলতে চাই।
সুমি ধনাঢ্য পিতার আদরের দুলালী। কি নেই তার? যেমন চেহারা, তেমনি স্বাস্থ্য। শিক্ষা-দীক্ষায়, চাল-চলনে চরিত্র-মাধুর্যে আর দশটা মেয়ের চেয়ে সে ভিন্ন। উচ্চ শিক্ষার অহংকার তার মাঝে নেই, পিতার অঢেল সম্পদের গর্বও তাকে কখনও কেউ করতে দেখেনি। ব্যস্ততম শহরের আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে বেড়ে উঠেছে সে; কিন্তু তার মাঝে কোন উচ্ছৃংখলতা নেই, নেই বেলেল্লাপনা। এক কথায় কমনীয় চেহারার অতুলনীয় ভদ্র-শালীন মেয়ে সুমি। যে কেউ দেখলে তাকে একবাক্যে পসন্দ করবে। অথচ তার এই গুণাবলী সকলের মন জয় করতে পারলেও তার স্বামীকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। পিতা অনেক আশা করে চোখের পুঁতলি, নয়নের মণি মেয়েকে কাছে রাখবেন বলে বাড়ীর পাশে বিবাহ দেন। মেয়ের সাথে তার পরিবারে প্রয়োজনী সবই তিনি দেন। কনের গাড়ীর সাথে ট্রাক ভর্তি করে সব জিনিস যায় বরের বাড়ী। বর-কনের রুম সজ্জিত হয় কনের পিতার দেওয়া খাট, সোফা, আলমারী সহ অন্যান্য আসবাব পত্রে। পিতার দেওয়া উপহার সামগ্রীতে বরের বাড়ী সজ্জিত হ’লেও সুমির নিজের জীবনটা সাজানো হ’ল না। সে জীবনটাকে রাঙাতে পারল না নিজের মত করে।
আলাপ-পরিচয়ের পূর্বেই অর্থাৎ বিয়ের পরের দিনই সুমির স্বামী প্রবাসী হয় ইউরো-ডলারের লোভে। প্রাণপ্রিয় স্বামী প্রবাসী হওয়ার পর এক যুগ কেটে গেছে, সুমির খবর সে নেয়নি। সুমি কেবল স্বামীর ভালবাসা লাভের মানসে ৪টি বছর শয্যাশায়ী শ্বশুরের অকৃত্রিম সেবা-শুশ্রূষা করে। এক যুগ ধরে স্বামীর অপেক্ষায় থাকে সে। হয়তো স্বামী একদিন এসে তাকে আদরে-সোহাগে নিজের করে নেবে। কিন্তু তার সে স্বপ্ন পূরণ হয় না, তার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এক সময় জানিয়ে দেয় যে, আমাকে স্বামী হিসাবে পাওয়ার কোন আশা বা চেষ্টা কোনটাই তুমি কর না। একথা শুনে সুমি যেন আকাশ থেকে পড়লো। চোখের জলে বুক ভাসাল সে। পানাহার ছেড়ে দিল। স্বামীর এহেন আচরণের কথা সে ভুলতে পারে না। তার কানে ঐ কথাটিই যেন বার বার অনুরণিত হয়। এটাকে সে দূর করতে পারে না। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজে পায় না। অবশেষে সে এ দুঃস্বপ্নের কবল থেকে মুক্তির জন্য বেছে নেয় সিডাক্সিন (ঘুমের বড়ি)। সারা দিন ঘুমের বড়ি খেয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু যখন ঘুম ভেঙ্গে যায়, ঐ কথা আবার তার মনে পড়ে যায়, তখন সে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরিবারের অন্যদের সতর্ক দৃষ্টির কারণে সেটাও হয়ে ওঠে না। এরই মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ অবলম্বন পিতা মারা যান, এর অব্যবহিত পরে মারা যান বড় ভাইও। এমনি এক দুঃখের সাগরে ভাসতে থাকে সুমি। জীবন তার কাছে হয়ে ওঠে বিতৃষ্ণ। কিন্তু কি করবে সে?
পরিবারের অন্যরা তাকে চেষ্টা করে অন্যত্র বিবাহ দেওয়ার কিন্তু সে রাযী হয় না। সে বিশ্বাস করতে পারে না অন্য কোন পুরুষকে। সে ভাবে আমার স্বামী যদি আমাকে গ্রহণ নাই করবে, তাহ’লে কেন সে এ বিয়েতে রাযী হ’ল। তার মত হয়তো সব পুরুষ হৃদয়হীন নিরেট পাথরে গড়া। তাই সে বিশ্বাস করতে পারে না যে, অন্য কেউ তাকে ভালভাবে গ্রহণ করবে। পরিবারের কথামত অন্যত্র বিবাহ না করায় ভাই-বোনেরা, এমনকি গর্ভধারিনী মায়েরও সে চক্ষুশুলে পরিণত হয়েছে। তাই এ জীবনের ভার বহন করা আজ তার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। সুমি জানে না কি তার দোষ? তার এই সুন্দর জীবনটা নষ্টের জন্য কে দায়ী, তার পরিবার, নাকি স্বামী নামের ঐ মানুষটি? নারীর অতি সাধের ঘর সুমির বাঁধা হ’ল না, এর জন্য কি সমাজ দায়ী নয়? এর জন্য কি শিক্ষা ব্যবস্থা দায়ী নয়?
অতএব আমাদেরকে এই সমাজ পরিবর্তনে, শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনে এগিয়ে আসতে হবে। যাতে কোন নিরীহ মানুষ নির্যাতিত না হয়, কোন প্রাপক বঞ্চিত না হয়, কোন মানুষ অধিকার হারা না হয়, কারো সুন্দর জীবন বিনষ্ট না হয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর সমাজ রেখে যাওয়ার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন- আমীন!
– শামীমা ফেরদৌসী। মোল্লাহাট, বাগেরহাট।
Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া
Subscribe to get the latest posts sent to your email.







golpoti valo vabe buja gelo na
aro aktu clear kore likhle valo hoto