নও মুসলিম

ফরাসী সাহিত্যের উচ্চতর ডিগ্রীধারী খাওলা নাকাতা’র ইসলাম গ্রহন

খাওলা নাকাতা একজন জাপানী নাগরিক। ফরাসী সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের জন্য তিনি ফ্রান্সে গমন করেন। ফ্রান্সে অবস্থানকালে ১৯৯১ সালের জানুয়ারী মাসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালের দিকে রিয়াদস্থ জাপানী দূতাবাসে কর্মরত তাঁর স্বামীর সাথে রিয়াদে আগমন করেন। ২৫/১০/১৯৯৩ তারিখে তিনি সঊদী আরবের আল-কাসিম প্রদেশের কেন্দ্র ‘বুরাইদা’ শহরের ইসলামী কেন্দ্রের মহিলা বিভাগে ‘ইসলাম ও পর্দা’ সম্পর্কে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ইংরেজি ভাষায় একটি লিখিত প্রবন্ধ পড়ে শোনান এবং উপস্থিত বোনদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন। ফরাসী সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রীধারী জাপানী নাগরিক খাওলা নাকাতার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী ও হিজাব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা শুনুন তার নিজের কণ্ঠেই- খাওলা নাকাতা বলেন, ফ্রান্সে অবস্থানকালে আমি ইসলাম গ্রহণ করি। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে অধিকাংশ জাপানীর ন্যায় আমিও কোন ধর্মের অনুসারী ছিলাম না। ফ্রান্সে আমি ফরাসী সাহিত্যের উপরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর লেখাপড়ার জন্য এসেছিলাম। আমার প্রিয় লেখক ও চিন্তাবিদ ছিলেন সাঁর্তে, নিৎশে ও কামাস। এদের সকলের চিন্তাধারা ছিল নাস্তিকতাভিত্তিক।

ধর্মহীন ও নাস্তিকতা প্রভাবিত হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। আমার আভ্যন্তরীণ কোন প্রয়োজনে নয়, শুধুমাত্র জানার আগ্রহই আমাকে ধর্ম সম্পর্কে উৎসাহী করে তোলে। মৃত্যুর পরে আমার কি হবে তা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা ছিল না; বরং কিভাবে জীবন কাটাব এটাই ছিল আমার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

দীর্ঘদিন ধরে আমার মনে হচ্ছিল আমি আমার সময় নষ্ট করে চলেছি, যা করার তা কিছুই করছি না। ঈশ্বরের বা স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকা বা না থাকা আমার কাছে সমান ছিল। আমি শুধু সত্যকে জানতে চাইছিলাম। যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব থাকে তাহ’লে তাঁর সাথে জীবন যাপন করব, আর যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব খুঁজে না পাই তাহ’লে নাস্তিকতার জীবন বেছে নেব এটাই আমার উদ্দেশ্য।

ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে আমি পড়াশুনা করতে থাকি। ইসলাম ধর্মকে আমি ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি। আমি কখনো চিন্তা করিনি যে, এটা পড়াশোনার যোগ্য কোন ধর্ম। আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, ইসলাম ধর্ম হ’ল মূর্খ ও সাধারণ মানুষদের একধরণের মূর্তিপূজার ধর্ম। কত অজ্ঞই না আমি ছিলাম!

আমি কিছু খৃষ্টানের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করি। তাদের সাথে আমি বাইবেল অধ্যয়ন করতাম। বেশ কিছুদিন গত হবার পর আমি স্রষ্টার অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমি এক নতুন সমস্যার মধ্যে পড়লাম। আমি কিছুতেই আমার অন্তরে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে পারছিলাম না, যদিও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে। আমি গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু চেষ্টা বৃথা হ’ল। তখন আমি স্রষ্টার অনুপস্থিতি খুব প্রবলভাবে অনুভব করতে লাগলাম।

তখন আমি বৌদ্ধ ধর্ম অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। আশা করছিলাম এ ধর্মের অনুশাসন পালনের এবং যোগাভাসের মাধ্যমে আমি ঈশ্বরকে অনুভব করতে পারব। খৃষ্টান ধর্মের ন্যায় বৌদ্ধধর্মেও আমি অনেক কিছু পেলাম, যা সত্য ও সঠিক বলে মনে হ’ল। কিন্তু অনেক বিষয় আমি বুঝতে বা গ্রহণ করতে পারলাম না। আমার ধারণা ছিল, ঈশ্বর বা স্রষ্টা যদি থাকেন তাহ’লে তিনি হবেন সকল মানুষের জন্য এবং সত্য ধর্ম অবশ্যই সবার জন্য সহজ ও বোধগম্য হবে। আমি বুঝতে পারলাম না, ঈশ্বরকে পেতে হ’লে কেন মানুষকে স্বাভাবিক জীবন পরিত্যাগ করতে হবে।

আমি এক অসহায় অবস্থায় নিপতিত হলাম। ঈশ্বরের সন্ধানে আমার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা কোন সমাধানে আসতে পারল না। এমতাবস্থায় আমি একজন আলজেরীয় মুসলিম মহিলার সাথে পরিচিত হ’লাম। তিনি ফ্রান্সেই জন্মেছেন, সেখানেই বড় হয়েছেন। তিনি ছালাত আদায় করতে জানতেন না। তার জীবনযাত্রা ছিল একজন সত্যিকার মুসলিমের জীবনযাত্রা থেকে অনেক দূরে। কিন্তু আল্লাহর প্রতি তার বিশ্বাস ছিল খুবই দৃঢ়। তার জ্ঞানহীন বিশ্বাস আমাকে বিরক্ত ও উত্তেজিত করে তোলে। তাই আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। শুরুতেই আমি পবিত্র কুরআনের এক কপি ফরাসী অনুবাদ কিনে আনি। কিন্তু আমি ২ পৃষ্ঠাও পড়তে পারলাম না, কারণ আমার কাছে তা খুবই অদ্ভুত মনে হচ্ছিল।

আমি একা একা ইসলাম বোঝার চেষ্টা ছেড়েদিলাম এবং প্যারিস মসজিদে গেলাম। আশা করছিলাম সেখানে কাউকে পাব, যিনি আমাকে সাহায্য করবেন।

সেদিন ছিল রবিবার এবং মসজিদে মহিলাদের একটি আলোচনা চলছিল। উপস্থিত বোনেরা আমাকে আন্তরিকতার সাথে স্বাগত জানালেন। আমার জীবনে এই প্রথম আমি ধর্মপালকারী একজন মুসলিমদের সাথে পরিচিত হলাম। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, নিজেকে তাঁদের মধ্যে অনেক সহজ ও আপন বলে অনুভব করতে লাগলাম; অথচ খৃষ্টান বান্ধবীদের মধ্যে সর্বদায় নিজেকে আগন্তুক ও দূরাগত অতিথি বলে অনুভব করতাম।

প্রত্যেক রবিবারে আমি আলোচনায় উপস্থিত হ’তে লাগলাম। সাথে সাথে মুসলিম বোনদের দেওয়া বইপত্র পড়তে লাগলাম। এসকল আলোচনার প্রতিটি মুহূর্ত এবং বইয়ের প্রতি পৃষ্ঠা আমার কাছে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশের মত মনে হ’তে লাগল। আমার মনে হচ্ছিল, আমি সত্যের সন্ধান পেয়েছি। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হ’ল, সেজদারত অবস্থায় আমি স্রষ্টাকে আমার অত্যন্ত কাছে অনুভব করতাম।

আমার পর্দা :

আরও দেখুন:  বছরের পর বছর লুকিয়ে নামাজ আদায় করেছি

দু’বছর আগে (১৯৯১ সালের জানুয়ারী মাসে), যখন ফ্রান্সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি, তখন মুসলিম স্কুলছাত্রীদের ওড়না বা স্কার্ফ দিয়ে মাথা ঢাকা নিয়ে ফরাসীদের বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। অধিকাংশ ফরাসী নাগরিকের ধারণা ছিল, ছাত্রীদের মাথা ঢাকার অনুমতিদান সরকারী স্কুলগুলোকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখার নীতির বিরোধী। আমি তখনো ইসলাম গ্রহণ করিনি। তবে আমার বুঝতে খুব কষ্ট হ’ত, মুসলিম ছাত্রীদের মাথায় ওড়না বা স্কার্ফ রাখার মত সামান্য একটি বিষয় নিয়ে ফরাসীরা এত অস্থির কেন? দৃশ্যতঃ মনে হচ্ছিল যে, ফ্রান্সের জনগণ তাদের ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা, বৃহৎ শহরগুলোতে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি আরব দেশগুলো থেকে আসা বহিরাগতদের ব্যাপারে উত্তেজিত ও স্নায়ুপীড়িত হযে পড়েছিলেন, ফলে তারা তাদের শহরগুলোতে ও স্কুলগুলোতে ইসলামী পোশাক দেখতে আগ্রহী ছিলেন না।

অপরদিকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে মেয়েদের মধ্যে, বিশেষ করে যুবতীদের মধ্যে ইসলামী হিজাব বা পর্দার দিকে ফিরে আসার জোয়ার এসেছে। অনেক আরব বা মুসলিম এবং অধিকাংশ পাশ্চাত্য জনগণের কাছে এটা ছিল কল্পনাতীত; কারণ তাদের ধারণা ছিল যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রসারের সাথে সাথে পর্দা প্রথার বিলুপ্তি ঘটবে।

ইসলামী পোশাক ও পর্দা ব্যবহারের আগ্রহ ইসলামী পুনর্জাগরণের একটা অংশ। এর মাধ্যমে আরব ও মুসলিম জনগোষ্ঠীসহ তাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট, অর্থনৈতিক ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মাধ্যমে সে গৌরব বিনষ্ট ও পদদলিত করার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করা হচ্ছে।

জাপানী জনগণের দৃষ্টিতে মুসলিমদের পুরোপুরি ইসলাম পালন একধরণের পাশ্চাত্য বিরোধিতা ও প্রাচীনকে আঁকড়ে ধরে রাখার মানসিকতা, যা মেজি যুগে জাপানীদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তখন তারা প্রথম পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে আসে এবং পাশ্চাত্য জীবনযাত্রা ও পোশাক পরিচ্ছদের বিরোধিতা করে।

মানুষ সাধারণত ভালমন্দ বিবেচনা না করেই যেকোন নতুন বা অপরিচিত বিষয়ের বিরোধিতা করে থাকে। কেউ কেউ মনে করেন যে, হিজাব বা পর্দা হচ্ছে মেয়েদের নিপীড়নের একটি প্রতীক। তারা মনে করেন, যে সকল মহিলা পর্দা মেনে চলে বা চলতে আগ্রহী তারা মূলতঃ প্রচলিত প্রথার দাসত্ব করেন। তাদের বিশ্বাস, এ সকল মহিলাকে যদি তাদের ন্যক্কারজনক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা যায় এবং তাদের মধ্যে নারীমুক্তি আন্দোলন ও স্বাধীন চিন্তার আহবান সঞ্চারিত করা যায়, তাহ’লে তারা পর্দাপ্রথা পরিত্যাগ করবে।

এধরণের উদ্ভট ও বাজে চিন্তা শুধু তারাই করেন, যাদের ইসলাম সম্পর্কে ধারণা খুবই সীমাবদ্ধ। ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মবিরোধী চিন্তাধারা তাদের মনমগজ এমনভাবে অধিকার করে নিয়েছে যে, তারা ইসলামের সার্বজনীনতা বুঝতে একেবারেই অক্ষম। আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বের সর্বত্র অগণিত অমুসলিম মহিলা ইসলাম গ্রহণ করছেন, যাদের মধ্যে আমিও একজন। এদ্বারা আমরা ইসলামের সার্বজনীনতা বুঝতে পারি।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইসলামী হিজাব বা পর্দা অমুসলিমদের জন্য একটি অদ্ভুত ও বিস্ময়কর ব্যাপার। পর্দা শুধু নারীর মাথার চুলই ঢেকে রাখে না, উপরন্তু আরো এমন কিছু আবৃত করে রাখে, যেখানে অন্যদের কোন প্রবেশাধিকার নেই। আর এজন্যই তারা খুব অস্বস্তি বোধ করেন। বস্ত্ততঃ পর্দার অভ্যন্তরে কি আছে বাইরে থেকে তারা তা মোটেও জানতে পারেন না।

প্যারিসে অবস্থানকালেই ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি হিজাব বা পর্দা মেনে চলতাম। আমি একটা স্কার্ফ দিয়ে আমার মাথা ঢেকে নিতাম। পোশাকের সংগে মিলিয়ে একই রঙের স্কার্ফ ব্যবহার করতাম। হয়ত অনেকে এটাকে নতুন একটা ফ্যাশন ভাবত। সঊদী আরবে অবস্থানকালে আমি কাল বোরকায় আমার সমস্ত দেহ আবৃত করে রাখতাম, এমনকি আমার মুখম-ল এবং চোখও।

যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করতে পারব কি-না, অথবা পর্দা করতে পারব কি-না তা নিয়ে আমি গভীরভাবে ভেবে দেখিনি। আসলে আমি নিজেকে এ নিয়ে প্রশ্ন করতে চাইনি; কারণ আমার ভয় হত, হয়ত উত্তর হবে না সূচক এবং তাতে আমার ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত বিঘ্নিত হতে পারে। প্যারিসের মসজিদে যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি এমন এক জগতে বাস করেছি, যার সাথে ইসলামের সামান্যতম সম্পর্ক ছিল না। ছালাত, পর্দা কিছুই আমি চিনতাম না। আমার জন্য একথা কল্পনা করাও কষ্টকর ছিল যে, আমি ছালাত আদায় করছি বা পর্দা পালন করে চলছি। তবে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা আমার এত গভীর ও প্রবল ছিল যে, ইসলাম গ্রহণের পরে আমার কি হবে তা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। বস্ত্ততঃ আমার ইসলাম গ্রহণ ছিল আল্লাহর অলৌকিক দান ও রহমতের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আল্লাহ আকবার!

আরও দেখুন:  ড. আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস

ইসলামী পোশাক বা হিজাবে আমি নিজেকে নতুনভাবে অনুভব করলাম। আমি অনুভব করলাম যে, আমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়েছি, আমি সংরক্ষিত হয়েছি। আমি আরো অনুভব করতে লাগলাম যে, আল্লাহ আমার সঙ্গে রয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

একজন বিদেশিনী হিসাবে অনেক সময় আমি লোকের দৃষ্টির সামনে বিব্রতবোধ করতাম। হিজাব ব্যবহারে এ অবস্থা কেটে যায় এবং পর্দা আমাকে এ ধরনের অভদ্র দৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। পর্দার মধ্যে আমি আনন্দ ও গৌরববোধ করতে লাগলাম। কারণ পর্দা শুধু আল্লাহর প্রতি আমার আনুগত্যের প্রতীকই নয়, উপরন্তু তা মুসলিম নারীদের মাঝে আন্তরিকতার বাঁধন। পর্দার মাধ্যমে আমরা ইসলাম পালনকারী মহিলারা একে অপরকে চিনতে পারি এবং আন্তরিকতা অনুভব করি। সর্বোপরি পর্দা আমার চারপাশের সবাইকে মনে করিয়ে দেয় আল্লাহর কথা। আর আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ আমার সাথে রয়েছেন। পর্দা আমাকে বলে দেয়, ‘সতর্ক হও! একজন মুসলিম নারীর যোগ্য কর্ম কর’।

একজন পুলিশ যেমন ইউনিফরম পরিহিত অবস্থায় তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন, তেমনি পর্দার মধ্যে আমি একজন মুসলিম হিসাবে নিজেকে বেশি করে অনুভব করতে লাগলাম। আমি যখনই মসজিদে যেতাম তখনই হিজাব ব্যবহার করতাম। এটা ছিল আমার সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ব্যাপার, কেউই আমাকে পর্দা করতে চাপ দেয়নি।

ইসলাম গ্রহণের দুই সপ্তাহ পর আমি আমার এক বোনের বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য জাপানে যাই। সেখানে যাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নিই, ফ্রান্সে আর ফিরে যাব না। কারণ ইসলাম গ্রহণের পর ফরাসী সাহিত্যের প্রতি আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। উপরন্তু আরবী ভাষা শেখার প্রতি আমি আগ্রহ বেশী হ’তে থাকে।

মুসলিম পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে একাকী জাপানের একটি ছোট্ট শহরে বসবাস করা আমার জন্য একটা বড় ধরণের পরীক্ষা ছিল। তবে এ একাকিত্ব আমার মধ্যে মুসলমানিত্বের অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর করে তোলে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলাদের জন্য শরীর দেখানো পোশাক পরা নিষিদ্ধ। কাজেই আমার আগের মিনি-স্কার্ট, হাফহাতা ব্লাউজ ইত্যাদি অনেক পোশাকই আমাকে পরিত্যাগ করতে হ’ল। এছাড়া পাশ্চাত্য ফ্যাশন ইসলামী হিজাব বা পর্দার পরিপন্থী। এজন্য আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে, নিজের পোশাক নিজেই তৈরি করে নেব। আমার এক পোশাক তৈরিতে অভিজ্ঞ বান্ধবীর সহযোগিতায় আমি দু’সপ্তাহের মধ্যে আমার জন্য পোশাক তৈরি করে ফেললাম। পোশাকটি ছিল অনেকটা পাকিস্তানী সেলোয়ার-কামিজের মত। আমার এই অদ্ভুত পোশাক দেখে কে কি ভাবল তা নিয়ে আমি কখনো মাথা ঘামাইনি।

জাপানে ফেরার পর ছয়মাস এভাবে কেটে গেল। কোন মুসলিম দেশে গিয়ে আরবী ভাষা ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা করার আগ্রহ আমার মধ্যে খুবই প্রবল হয়ে উঠল। এ আগ্রহ বাস্তবায়িত করতে সচেষ্ট হ’লাম। অবশেষে মিশরের রাজধানী কায়রোতে পাড়ি জমালাম।

কায়রোতে মাত্র এক ব্যক্তিকেই আমি চিনতাম। আমার এই মেযবানের পরিবারের কেউই ইংরেজি জানত না। ফলে আমি আশাহত হয়ে একেবারেই ভেঙ্গে পড়লাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হ’ল, যে মহিলা আমাকে হাত ধরে বাসার ভিতরে নিয়ে গেলেন তিনি বোরকায় তাঁর মুখমন্ডল ও হাত সহ মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর ঢেকে রেখেছিলেন। এ ফ্যাশান (বোরকা) এখন আমার অতি পরিচিত এবং রিয়াদে অবস্থানকালে আমি নিজেও এই পোশাক ব্যবহার করি। কিন্তু কায়রোতে পৌঁছেই এটা দেখে আমি খুবই আশ্চর্য হই।

ফ্রান্সে থাকতে একদিন আমি মুসলিমদের একটা বড় ধরণের কনফারেন্সে উপস্থিত হয়েছিলাম এবং সেখানেই আমি সর্বপ্রথম এ ধরণের মুখঢাকা কালো পোশাক দেখতে পাই। রং বেরঙের স্কার্ফ ও পোশাক পরা মেয়েদের মাঝে তাঁর পোশাক খুবই বেমানান লাগছিল। আমি ভাবছিলাম, এ মহিলা মূলতঃ আরব ট্রাডিশন ও আচরণের অন্ধ অনুকরণের ফলেই এ রকম পোশাক পরেছেন, ইসলামের সঠিক শিক্ষা তিনি জানতে পারেননি। ইসলাম সম্পর্কে তখনো আমি বিশেষ কিছু জানতাম না। আমার ধারণা ছিল, মুখ ঢেকে রাখা একটা আরবীয় অভ্যাস ও আচরণ, ইসলামের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। কায়রোর ঐ মহিলাকে দেখেও আমার অনেকটা অনুরূপ চিন্তাই মনে এসেছিল। আমার মনে হয়েছিল, পুরুষদের সাথে সকল প্রকার সংযোগ এড়িয়ে চলার যে প্রবণতা এই মহিলার মধ্যে রয়েছে তা অস্বাভাবিক।

কালো পোশাক পরা এক বোন আমাকে জানালেন যে, আমার নিজের তৈরি পোশাক বাইরে বেরোনোর উপযোগী নয়। আমি তার কথা মেনে নিতে পারিনি। কারণ আমার বিশ্বাস ছিল, একজন মুসলিম মহিলার পোশাকের যে সকল বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা সবই আমার ঐ পোশাকে ছিল।

তবুও আমি ঐ মিশরীয় বোনের মত ম্যাক্সি ধরণের কাল রঙের বড় একটা কাপড় কিনলাম, যা গলা থেকে পা পর্যন্ত আবৃত করে। উপরন্তু একটি কাল খিমার অর্থাৎ বড় ধরনের শরীর জড়ানো চাদরের মত ওড়না কিনলাম, যা দিয়ে আমার শরীরের উপরিভাগ, মাথা ও দু’বাহু আবৃত করে নিতাম। আমি আমার মুখ ঢাকতেও রাযী ছিলাম, কারণ দেখলাম তাতে বাইরের রাস্তর ধুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমার বোনটি জানালেন, মুখ ঢাকার কোন প্রয়োজন নেই। শুধু ধুলা থেকে বাঁচার জন্য মুখ ঢাকা নিষ্প্রয়োজন। তিনি নিজে মুখ ঢেকে রাখতেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তা ঢেকে রাখা আবশ্যক।

আরও দেখুন:  ইসলামে আসার গল্প: দেখছি আমার মা আগুনে জ্বলছে, সত্যই কি এটি বিধাতার হুকুম?

মুখ ঢেকে রাখা যে সকল বোনের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল, কায়রোতে তাঁদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। কায়রোর অনেক মানুষ কাল খিমার বা ওড়না দেখলেই বিরক্ত বা বিব্রত হয়ে উঠতেন। পাশ্চাত্য ধাঁচে জীবন-যাপনকারী সাধারণ মিশরীয় যুবকেরা এ সকল খিমারে ঢাকা পর্দানশীন মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। এদেরকে তাঁরা ‘ভগ্নীগণ’ বলে সম্বোধন করতেন। রাস্তঘাটে বা বাসে উঠলে সাধারণ মানুষেরা এদেরকে বিশেষ সম্মান করতেন ও ভদ্রতা দেখাতেন। এসকল মহিলা রাস্তঘাটে একে অপরকে দেখলে আন্তরিকতার সাথে সালাম বিনিময় করতেন, তাঁদের মধ্যে কোন ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও।

ইসলাম গ্রহণের আগে আমি স্কার্টের চেয়ে প্যান্ট বেশি পসন্দ করতাম। কিন্তু কায়রো এসে লম্বা ঢিলেঢালা কালো পোশাক পরতে শুরু করি। শীঘ্রই আমি এই পোশাককে পসন্দ করে ফেলি। এ পোশাক পরে নিজেকে অত্যন্ত ভদ্র ও সম্মানিত মনে হ’ত। মনে হ’ত আমি একজন রাজকন্যা। তাছাড়া এ পোশাকে আমি বেশ আরামবোধ করতাম, যা প্যান্ট পরে কখনো অনুভব করিনি।

খিমার বা ওড়না পরা বোনদেরকে সত্যিই অপূর্ব সন্দর দেখাতো। তাদের চেহারায় এক ধরণের পবিত্রতা ও সাধুতা ফুটে উঠত। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মুসলিম নারী বা পুরুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর নির্দেশাবলী পালন করে এবং সেজন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে। আমি ঐ সকল মানুষের মানুসিকতা মোটেও বুঝতে পারি না, যাঁরা ক্যাথলিক সিস্টারদের ঘোমটা দেখলে কিছুই বলেন না, অথচ মুসলিম মহিলাদের ঘোমটা বা পর্দার সমালোচনায় তাঁরা পঞ্চমুখ। কারণ এটা না-কি নিপীড়ন ও সন্ত্রাসের প্রতীক!

মিশরীয় এক বোন আমাকে বলেন, আমি যেন জাপানে ফিরে গিয়েও এ পোশাক ব্যবহার করি। এতে আমি অসম্মতি জানাই। আমার ধারণা ছিল, আমি যদি এ ধরণের পোশাক পরে জাপানের রাস্তায় বের হই তাহ’লে মানুষ আমাকে অভদ্র ও অস্বাভাবিক ভাববে। পোশাকের কারণে তারা আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। আমার কোন কথাই তারা শুনবে না। আমার বাইরের বেশ-ভূষা দেখেই তারা ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করবে। ইসলামের মহান শিক্ষা ও বিধানাবলী জানতে চাইবে না।

আমার মিশরীয় বোনকে আমি এ যুক্তিই দেখিয়েছিলাম। কিন্তু দু’মাসের মধ্যে আমি আমার নতুন পোশাককে ভালবেসে ফেলি। তখন আমি ভাবতে লাগলাম, জাপানে গিয়েও আমি এ পোশাকই পরব। এ উদ্দেশ্যে আমি জাপানে ফেরার কয়েকদিন আগে হালকা রঙের ঐ জাতীয় কিছু পোশাক এবং কিছু সাদা খিমার (বড় চাদর জাতীয় ওড়না) তৈরি করলাম। আমার ধারণা ছিল, কালোর চেয়ে এগুলো বেশি গ্রহণযোগ্য হবে সাধারণ জাপানীদের দৃষ্টিতে।

আমার সাদা খিমার বা ওড়নার ব্যাপারে জাপানীদের প্রতিক্রিয়া ছিল আমার ধারণার চেয়ে অনেক ভাল। মূলতঃ আমি কোনরকম প্রত্যাখ্যান বা উপহাসের সম্মুখীন হইনি। মনে হচ্ছিল, জাপানীরা আমার পোশাক দেখে আমি কোন ধর্মাবলম্বী তা না বুঝলেও আমার ধর্মানুরাগ বুঝে নিচ্ছিল। একবার আমি শুনলাম, আমার পিছনে এক মেয়ে তার বান্ধবীকে আসেত্ম আসেত্ম বলছে, দেখ একজন বৌদ্ধ ধর্মজাযিকা।

একবার ট্রেনে যেতে আমার পাশে বসলেন এক আধাবয়সী ভদ্রলোক। কেন আমি এরকম অদ্ভুত ফ্যাশানের পোশাক পরেছি তা তিনি জানতে চাইলেন। আমি তাকে বললাম, আমি একজন মুসলিম। ইসলাম ধর্মে মেয়েদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন তাদের দেহ ও সৌন্দর্য আবৃত করে রাখে। কারণ তাদের অনাবৃত দেহসুষমা ও সৌন্দর্য পুরুষদেরকে আকর্ষিত করে তুলতে পারে। অনেক পুরুষের জন্য এ ধরণের আকর্ষণ প্রতিরোধ করা কষ্টকর। তাই নারীদের উচিৎ নয় দেহ ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করে তাদেরকে বিরক্ত করা বা সমস্যায় ফেলা।

মনে হ’ল আমার ব্যাখ্যায় তিনি অত্যন্ত প্রভাবিত হলেন। ভদ্রলোক সম্ভবত আজকালকার মেয়েদের উত্তেজক ফ্যাশান মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁর নামার সময় হয়েছিল। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে নেমে গেলেন এবং বলে গেলেন তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল ইসলাম সম্পর্কে আরো কিছু জানার। কিন্তু সময়ের অভাবে পারলেন না।

গ্রীষ্মকালের রৌদ্রতপ্ত দিনেও আমি পুরো শরীর ঢাকা লম্বা পোশাক পরে এবং ‘খিমার’ দিয়ে মাথা ঢেকে বাইরে যেতাম। এতে আমার আববা দুঃখ পেতেন। ভাবতেন আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি দেখলাম রৌদ্রের মধ্যে আমার এ পোশাক খুবই উপযোগী। কারণ এতে মাথা, ঘাড় ও গলা সরাসরি রোদের তাপ থেকে রক্ষা পেত। উপরন্তু আমার বোনেরা যখন হাফপ্যান্ট পরে চলাফেরা করত, তখন ওদের সাদা ঊরু দেখে আমি অস্বস্তিবোধ করতাম।

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button