আদব ও আমল

অন্তরের আমল-২ (নিয়ত)

অন্তরের একটি অন্যতম আমল হচ্ছে: নিয়ত

নিয়ত আরবি শব্দ। অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা ও সংকল্প। নিয়ত না করলে কোন ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

 إنَّمَا الأعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَ إنَّمَا لِكُلِّ امْرِىءٍ مَا نَوَى

প্রতিটি আমল গ্রহণযোগ্য না অগ্রহণযোগ্য তা নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যার সে নিয়ত করে।  (বুখারী ও মুসলিম) আবদুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) বলেন, অনেক সময় নিয়তের কারণে ছোট আমলে  ছওয়াব বেশী হয়। আবার নিয়তের কারণে বড় আমলে ছওয়াব কম হয়।

ফুযায়ল বিন ইয়ায (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তো তোমার নিয়ত ও ইচ্ছাটাই দেখতে চান। আমলটি যদি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়, তবে তাকে বলা হয় ইখলাস। অর্থাৎ আমলটি শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যেই হবে, তাতে কারো কোন অংশ থাকবে না। আর আমল যদি গাইরুল্লাহর জন্য হয়, তবে তাকে বলা হয় রিয়া বা মুনাফেকি অথবা অন্য কিছু।

উপকারীতাঃ জ্ঞানী লোক ছাড়া সমস্ত মানুষই ধ্বংসপ্রাপ্ত। জ্ঞানীদের মধ্যে সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত আমলকারীরা ব্যতীত। আমলকারীরা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত- তাদের মধ্যে একনিষ্ঠ লোকেরা ব্যতীত। অতএব যে বান্দা আল্লাহর আনুগত্য করতে চায় তার সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে নিয়ত সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। অতঃপর আমলের মাধ্যমে নিয়তকে বিশুদ্ধ করা। সেই সাথে সততা ও ইখলাসের হাকীকত সঠিকভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করা। সুতরাং নিয়ত ছাড়া নেক আমল ক্লান্তি বা পণ্ডশ্রম। আর ইখলাস ছাড়া নিয়ত হচ্ছে রিয়া। আর ঈমানের বাস্তবায়ন ছাড়া ইখলাস মূল্যহীন।

 মানুষের যাবতীয় কাজকর্ম তিনভাগে বিভক্ত:

১) পাপকর্ম। পাপকর্মে সৎ নিয়ত করলে তা ভালকাজে রূপান্তরিত হবে না। (যেমন সুদ নেয়ার সময় নিয়ত করল তা গরীবকে দান করবে)। কিন্তু পাপের সময় খারাপ নিয়ত করে তাহলে তার পাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।

২) স্বাভাবিক বৈধ কাজ-কর্ম। প্রতিটি কাজে মানুষের কোন না কোন নিয়ত বা উদ্দেশ্য থাকে, ভাল নিয়তের মাধ্যমে সাধারণ বৈষয়িক ক্রিয়া-কর্ম নেক কাজে রূপান্তরিত হতে পারে।

৩) আনুগত্যশীল নেক কাজ (ইবাদত)। এধরণের কাজ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্যে এবং প্রতিদান বৃদ্ধির জন্যে তাতে নিয়ত থাকতে হবে। নেক কাজ করে যদি রিয়া বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য হয়,তবে তা গুনাহের কাজ তথা ছোট শিরকে পরিণত হয়ে যাবে, কখনো বড় শিরকেও পরিণত হতে পারে।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,যে ব্যক্তি সৎ কর্মের নিয়ত করে, অতঃপর তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম না হয়, তবে আল্লাহ তা পূর্ণ একটি সৎকর্ম হিসেবে লিখে নেন। আর নিয়ত করার পর যদি তা বাস্তবায়ন করে,তবে আল্লাহ সে পুণ্যটিকে দশ থেকে সাতশত থেকে আরও অনেক গুণে বৃদ্ধি করে লিখে নেন। আর যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করার নিয়ত করার পর তা বাস্তবায়ন না করে,তবে আল্লাহ তা একটি পূর্ণ সৎকর্ম হিসেবে লিখে নেন। আর নিয়ত করার পর যদি তা বাস্তবায়ন করে ফেলে,তবে আল্লাহ তা একটি মাত্র পাপ কাজ হিসেবে লিখে থাকেন। (বুখারী ও মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, এ উম্মতের উদাহরণ চার ব্যক্তির ন্যায়:- (১) এমন ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ ও জ্ঞান দান করেছেন। স্বীয় সম্পদে সে ইলম অনুযায়ী আমল করে থাকে এবং হক পথে ব্যয় করে। (২) অপর এমন এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু কোন সম্পদ দেননি সে বলে, ঐ ব্যক্তির মত যদি আমার সম্পদ থাকত তবে তার মত আমিও তা ব্যবহার করতাম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, উভয় ব্যক্তি প্রতিদানের ক্ষেত্রে বরাবর। (৩) তৃতীয় ব্যক্তিকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু কোন জ্ঞান দান করেননি, ফলে সে তার সম্পদে মূর্খতা সুলভ আচরণ করে নাহক পথে তা ব্যয় করে। (৪) চতুর্থ ব্যক্তি, আল্লাহ তাকে না দিয়েছেন ধন-সম্পদ না জ্ঞান। সে বলে, এ ব্যক্তির ন্যায় যদি আমার (সম্পদ) থাকত তবে এমনভাবে তা ব্যয় করতাম যেমন সে করছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, উভয় ব্যক্তি পাপের ক্ষেত্রে এক সমান। (তিরমিযী)

আরও দেখুন:  অন্তরের আমল - ১

এ হাদীছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যক্তি তাদের সাধ্যানুযায়ী কথা বলেছে অর্থাৎ অন্তরের নিয়ত ও আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করেছে। বলেছে: আমার নিকট যদি ঐ ব্যক্তির মত সম্পদ থাকত,তবে তার মতই আমি তা ব্যবহার করতাম। এ জন্যে প্রত্যেককে তার নিয়ত ও কামনা অনুযায়ী ছওয়াব বা গুনাহ দেয়া হয়েছে।

হাফেয ইবনে রজব (রহঃ) বলেন, হাদীছের বাক্য: [প্রতিদানের ক্ষেত্রে উভয় ব্যক্তি বরাবর।] দ্বারা বুঝা যায়, উভয় ব্যক্তি আমলটির মূল প্রতিদানে বরাবর হবে। কিন্তু অতিরিক্ত প্রতিদানে বরাবর হবে না। অর্থাৎ নেককর্ম বাস্তবে রূপদানকারী মূল ছওয়াবসহ তাতে দশ থেকে সাতশত থেকে আরও বহুগুণ ছওয়াব লাভ করবে। কিন্তু শুধুমাত্র ইচ্ছাকারী নেক নিয়তের কারণে মূল আমলের ছওয়াব পেলেও বাস্তবায়ন করতে না পারার কারণে অতিরিক্ত (দশ থেকে সাতশত থেকে আরও বহুগুণ) ছওয়াব পাবে না। কেননা সবদিক থেকেই যদি উভয় ব্যক্তি বরাবর ছওয়াবের অধিকারী বলা হয়, তবে তা হাদীছের সম্পূর্ণ খেলাফ কথা হবে।

 ইবাদতের মধ্যে রিয়া তিনভাবে প্রবেশ করতে পারে:

১) ইবাদতের আসল উদ্দেশ্যই যদি হয় তা মানুষকে দেখানো। তখন ইবাদতটি শিরকে পরিণত হওয়ার কারণে বাতিল বলে গণ্য হবে।

২) ইবাদতটি আল্লাহর উদ্দেশ্যেই শুরু করবে, কিন্তু পরে তাতে রিয়া অনুভব করবে। এ অবস্থায় ইবাদতের শেষাংশ যদি প্রথমাংশের উপর নির্ভরশীল না হয়,তবে প্রথমাংশ বিশুদ্ধ হবে। যেমন একশত টাকা দান করল ইখলাসের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আর একশত টাকা দান করল রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। প্রথম দানটি এখানে কবুল হবে, কিন্তু দ্বিতীয় দানটি বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু ইবাদতের শেষাংশ যদি প্রথমাংশের উপর নির্ভরশীল হয়, যেমন নামায। তবে তার দুটি অবস্থা: (ক) ইবাদতকারী রিয়াকে প্রতিহত করবে এবং রিয়ার উপর স্থির থাকবে না। এ অবস্থায় রিয়া ইবাদতে কোন প্রভাব ফেলবে না বা সে গুনাহগার হবে না। (খ) ইবাদতকারী রিয়ার উপর সন্তুষ্ট থাকবে এবং তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে না। অর্থাৎ রিয়ার অনুভূতিকে লালন করবে। এ অবস্থায় পূর্ণ ইবাদতটিই বাতিল হয়ে যাবে এবং রিয়া বা ছোট শিরক করার অপরাধে সে গুনাহগার হবে।

আরও দেখুন:  রাস্তার আদব সমূহ

৩) ইবাদত শেষ করার পর রিয়া অনুভব হবে। এটা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এতে আমলের কোন ক্ষতি হবে না এবং আমলকারীরও কোন গুনাহ হবে না। কিন্তু অন্য কোন কারণে ইবাদতটি বাতিল হয়ে যেতে পারে। যেমন আমল করার পর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও গর্ব প্রকাশ করার জন্য ঐ বিষয়ে গল্প করে বা দান করার পর খোঁটা দেয়,তখন আমলটি বাতিল হয়ে যাবে। এছাড়া রিয়ার আরও অনেক গোপন বিষয় আছে,তা জানা ওয়াজিব এবং তা থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।

 নেক কাজের মাধ্যমে যদি দুনিয়া উপার্জন নিয়ত হয়,তবে নিয়ত অনুযায়ী তাতে নেকী অথবা গুনাহ হবে। এর তিনটি অবস্থা:

১) নেক আমলের আসল নিয়তই হচ্ছে শুধুমাত্র দুনিয়া উপার্জন করা,যেমন শুধুমাত্র বেতন পাওয়ার উদ্দেশ্যেই নামাযে ইমামতি করা। এ অবস্থায় সে পাপী ও গুনাহগার হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنْ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَعْنِي رِيحَهَا “

মহামহিম আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যে ইলম অর্জন করতে হয়, তা যদি কোন মানুষ শুধুমাত্র দুনিয়ার সম্পদ উপার্জনের উদ্দেশ্যে শিক্ষা করে, তবে সে কিয়ামত দিবসে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। (আবু দাউদ)

২) আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং সেই সাথে দুনিয়া অর্জনের নিয়তে আমল করা। এ ধরণের ব্যক্তির ঈমান ও ইখলাস অপূর্ণ। যেমন ব্যবসা এবং হজ্জ করার উদ্দেশ্যে হজ্জে যাওয়া। তার যতটুকু ইখলাস ও ঈমান থাকবে সে ততটুকু ছওয়াব পাবে।

৩) কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তেই নেক আমল করবে কিন্তু আমলটি যথাযথভাবে সম্পাদনের নিমিত্তে শ্রমের মূল্য স্বরূপ কিছু পারিশ্রমিক গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে আমলটিতে ছওয়াব পূর্ণ পাবে। অপরদিকে পারিশ্রমিক নেয়ার ফলে ছওয়াব হ্রাস হবে না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

আরও দেখুন:  আমল কবুলের উপায়

إِنَّ أَحَقَّ مَا أَخَذْتُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا كِتَابُ اللَّهِ “

তোমরা যে বিষয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ কর, তন্মধ্যে সর্বাধিক উপযুক্ত হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। (বুখারী)

 ইখলাস তথা একনিষ্ঠভাবে নেক আমলকারীরা তিন স্তরে বিভক্ত:

১) নিম্নস্তর: শুধুমাত্র ছওয়াব কামাই এবং শাস্তি থেকে বাঁচার নিয়তে আমল করবে।

২) মধ্যবর্তী স্তর: উপরোক্ত নিয়ত আছেই তার সাথে আরও নিয়ত করবে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্যে এবং তাঁর নির্দেশ পালনার্থে আমল করবে।

৩) উচ্চস্তর: পবিত্র আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান এবং ভয় রেখে তাঁর ইবাদত করবে। এটা হচ্ছে সিদ্দীকদের স্তর।

মহান আল্লাহ মূসা (আঃ) সম্পর্কে বলেন,وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضَى হে আমার পালনকর্তা! আমি তাড়াতাড়ি আপনার দরবারে এসে গেলাম,যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন। (সূরা ত্বাহাঃ ৮৪) মূসা (আঃ) শুধু আল্লাহর নির্দেশ পালনই নয়;বরং আগ্রহভরে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের জন্যে আগেভাগে এসে গেলেন, যাতে আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।

অনুরূপ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে নিম্নস্তর হচ্ছে: পিতামাতার অবাধ্য হলে শাস্তি পাবে শুধু এই  ভয়ে এবং সদাচরণ করছে ছওয়াব পাবে শুধু এই আশায় তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। মধ্যবর্তী স্তর হচ্ছে: আল্লাহর আদেশ পালনার্থে এবং তারা শিশুবস্থায় আমাকে লালন-পালন করেছেন তার কিছুটা উত্তম প্রতিদান দেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা। উচ্চস্তর হচ্ছে: মহামহিম আল্লাহর নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ ভালবাসা ও সম্মান রেখে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা।

 অনুবাদ: মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আল কাফী

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button