ইবাদত পরিচিতি

ইবাদত কবুলের শর্তাবলী

আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে ইবাদতের সকল নিয়ম-পদ্ধতি তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন। ফলে মানুষের ইচ্ছামত ইবাদত করার কোন অধিকার নেই। অতএব ইবাদত কবুলের মৌলিক শর্ত হ’ল দু’টি। যথা-

(১) একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে ইবাদত করা : ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে না হয়ে কোন পীর, দরবেশ, বুযুর্গানে দ্বীনের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হ’লে তা আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। বরং তা শিরকে পরিণত হবে। আর শিরক এমন একটি মহাপাপ যার কারণে জীবনের অর্জিত সকল নেক আমল ধ্বংস হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَوْ أَشْرَكُوْا لَحَبِطَ عَنْهُمْ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ ‘যদি তারা শিরক করে তবে তারা যা কিছু করেছে, সবই ধ্বংস হয়ে যাবে’ (আন‘আম ৬/৮৮)। তিনি অন্যত্র বলেন,وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ- ‘তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই (এ মর্মে) অহী হয়েছে যে, যদি তুমি শিরক কর তবে অবশ্যই তোমার কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার ৩৯/৬৫)। আর মৃত্যুর পরে তার জন্য জাহান্নাম নিশ্চিত হয়ে যায়। কেননা শিরককারীর জন্য আল্লাহ জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন। তিনি বলেন,إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ- ‘কেউ আল্লাহর সাথে শিরক করলে অবশ্যই আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করবেন এবং তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। বস্ত্ততঃ যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই’ (মায়েদাহ ৫/৭২)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ مَاتَ يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا دَخَلَ النَّارَ  ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[4]

(২) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুযায়ী ইবাদত করা : আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বিধানকে বাস্তবায়ন করার জন্য মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে প্রেরণ করেছেন এবং পৃথিবীর সকল মানুষকে একমাত্র তাঁরই আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِيْ شَيْءٍ فَرُدُّوْهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُوْلِ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্ল­াহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোন বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহ’লে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যর্পণ কর’ (নিসা ৪/৫৯)। তিনি অন্যত্র বলেন,

আরও দেখুন:  ইবাদত সংক্রান্ত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি

قُلْ أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُوْلَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ وَإِنْ تُطِيْعُوْهُ تَهْتَدُوْا وَمَا عَلَى الرَّسُوْلِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِيْنُ-

‘বল, তোমরা আল্ল­াহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। তারপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে সে শুধু তার উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরাই দায়ী। আর যদি তোমরা তার আনুগত্য কর তবে তোমরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। আর রাসূলের দায়িত্ব শুধু স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া’ (নূর ২৪/৫৪)। তিনি অন্যত্র বলেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُوْلٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللهِ ‘আর আমরা যে কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তা কেবল এজন্য যে, যেন আল্ল­াহর অনুমতিক্রমে তাদের আনুগত্য করা হয়’ (নিসা ৪/৬৪)। তিনি অন্যত্র বলেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيْظًا ‘যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্ল­াহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হ’ল, তবে আমি তোমাকে তাদের উপর তত্তবাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি’ (নিসা ৪/৮০)। তিনি অন্যত্র বলেন,

تِلْكَ حُدُوْدُ اللهِ وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُوْلَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْهَا وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ، وَمَنْ يَعْصِ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَيَتَعَدَّ حُدُوْدَهُ يُدْخِلْهُ نَارًا خَالِدًا فِيْهَا وَلَهُ عَذَابٌ مُهِيْنٌ

‘এগুলো আল্ল­াহর সীমারেখা। আর যে আল্ল­াহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্ল­াহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা। আর যে আল্ল­াহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করে আল্ল­াহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর তার জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি’ (নিসা ৪/১৩-১৪)। তিনি অন্যত্র বলেন,

وَمَنْ يُطِعِ اللهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِيْنَ أَنْعَمَ اللهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّيْقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِيْنَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيْقًا

আরও দেখুন:  কার ইবাদত করব, কেন করব?

‘আর যে আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করবে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ- যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী!’ (নিসা ৪/৬৯)। তিনি অন্যত্র বলেন,وَأَقِيْمُوْا الصَّلَاةَ  وَآتُوْا الزَّكَاةَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ ‘আর তোমরা ছালাত ক্বায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলেরে আনুগত্য কর যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হ’তে পার’ (নূর ২৪/৫৬)

উপরোল্লি­খিত আয়াত সমূহ ছাড়াও আরো অনেক আয়াতে আল্ল­াহ তা‘আলা বার বার নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা রাসূলুল্ল­াহ (ছাঃ)-এর আনুগত্য কর। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

فَمَنْ أَطَاعَ مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ، وَمَنْ عَصَى مُحَمَّدًا صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَدْ عَصَى اللهَ وَمُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَرْقٌ بَيْنَ النَّاسِ-

‘যে মুহাম্মাদের আনুগত্য করল, সে আল্ল­াহরই আনুগত্য করল। আর যে মুহাম্মাদের অবাধ্যতা করল, সে আসলে আল্ল­াহরই অবাধ্যতা করল। আর মুহাম্মাদ হ’লেন মানুষের মাঝে পার্থক্যের মাপকাঠি’।[5]

অতএব মুহাম্মাদ (ছাঃ)-ই আমাদের জন্য একমাত্র অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ইমাম, যার প্রতিটি কথা ও কর্ম আল্লাহ প্রদত্ত অহী। তিনি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন মানুষের অনুসরণ ও অনুকরণ করা সিদ্ধ নয়। উল্লেখ্য যে, ইবাদত কবুলের তৃতীয় শর্তটি হ’ল হালাল রূযী।[6]

মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম

লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।


[4]. বুখারী হা/১২৩৮; মুসলিম হা/৯২; মিশকাত হা/৩৮।

[5]. বুখারী হা/৭২৮১, ‘কুরআন ও সান্নাহকে অাঁকড়ে ধরা’ অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/১৪৪।

[6]. মুসলিম; মিশকাত হা/২৭৬০; বায়হাক্বী; মিশকাত হা/২৭৮৭

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

Back to top button