সুন্নাহ/হাদীছ

হাদীছ কি এবং কেনো? – ৫

৩. অনেক শরীয়তী বিধানের উৎসই হ’ল হাদীছ ঃ

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা’আলা অনেক গুণে গুণান্বিত করেছেন। তাঁর গুণাবলির মধ্যে একটি হ’ল, তিনি হালাল হারামের বিধানাবলী বর্ণনা করেন। আল্লাহ তাঅ’ালা বলেনঃ

وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ

‘তিনি তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ’। রাসুল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

مَا حَرَّمَ رَسُوْلُ الله كَمَا حَرَّمَ الله

‘আল্লাহর রাসূল যা হারাম করেছেন, তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তারই অনুরূপ’। এই জন্যই আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামী শরীয়তের হালাল-হারাম সম্পর্কীয় অনেক বিধান শুধু হাদীছ থেকেই গ্রহন করা হয়। অথচ কুরআনে তার কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। উদাহরণ স্বরূপ দু’একটি এখানে উল্লেখ করছিঃ-

(ক) একথা সবার জানা যে, ইসলামের শুরু অবস্থায় এমনকি হিজরতের পরেও কিছু দিন পর্যন্ত রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর ছাহাবীগণ ছালাতের জন্য ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’কেই কেবলা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কুরআনে বলা হয়েছে যে, তিনি আল্লাহর আদেশেই এটি করেছিলেন। যেমন আল্লাহ তাঅ’ালা বলেনঃ

وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنتَ عَلَيْهَا إِلاَّ لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْه.

‘আপনি যে কেবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যেই কেবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রাসূলের অনুসারী থাকে, আর কে পিঠটান দেয়’।

কিন্তু কুরআনের কোথাও বায়তুল মুকাদ্দাসকে কেবলা বানানোর কোন আদেশ পাওয়া যায়না। তা হলে বুঝা গেল যে এটি হাদীছ থেকেই পাওয়া একটি বিধান।

(খ) মানুষের যখন মৃত্যু হয় তখন মুমিন হলে তার জানাযার ছালাত পড়া ফরয। অথচ কুরআনের কোথাও জানাযার ছালাতের আদেশসুচক কোন আয়াত দেখা যায় না। কুরআনে এতটুকু বর্ণিত আছে যে, وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَدًا

‘আর তাদের মধ্য থেকে কারো মৃত্যু হ’লে তার উপর কখনও ছালাত পড়বেননা’।

এখানে মুনাফিক মারা গেলে তার উপর জানাযার ছালাত পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু মুসলমানের মৃত্যু হলে জানাযার ছালাত পড়া হবে কিনা সে ব্যাপারে কোন আদেশ কুরআনে নেই। বরং এই বিধান আমরা এক মাত্র হাদীছ থেকেই পেয়ে থাকি।

(গ) ছালাতের জন্য আযান দেয়া সহীহ উক্তি মতে ফরযে কেফায়া। অথচ আযানের আদেশসুচক কোন আয়াত কুরআনে নেই এবং আযানের শব্দগুলি কি হবে? তারও কোন বর্ণনা নেই। কুরআনে শুধু এতটুকুই বলা হয়েছে যে, যখন মুসলমানেরা আযান দেয়, তখন ইহুদী-খৃষ্টানেরা হাসি-তামাশা বা ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে। আল্লাহ তাঅ’ালা বলেনঃ

وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلاَةِ اتَّخَذُوهَا هُزُوًا وَلَعِبًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لاَّ يَعْقِلُونَ .

‘আর যখন তোমরা ছালাতের জন্য আহবান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে, কারণ তারা নির্বোধ’। অন্যত্র বলা হয়েছেঃ

إِذَا نُودِي لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ .

‘জুমার দিনে যখন ছালাতের জন্য আযান দেয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের পানে ত্বাড়া করে এস’।

তা হ’লে বুঝা গেল যে, আযানের বিধানটিও আমরা শুধুমাত্র হাদীছ থেকে পেলাম, কুরআনে থেকে নয়।

(ঘ) সাধারণতঃ ধারণা করা হয় যে সকল মৃত প্রাণী হারাম। কারণ কুরআন সকল মৃতকে হারাম ঘোষণা করেছে। অথচ দুই প্রকার মৃত প্রাণী আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তা হ’ল মাছ এবং টিড্ডি বা পঙ্গঁপাল। কিন্তু এসবের কোন বর্ণনা কুরআনে নেই, শুধু হাদীছ থেকেই এই বিধান পাওয়া যায়।

(ঙ) এমনিভাবে সাধারণতঃ মনে করা হয় যে সকল রক্ত হারাম। কারণ কুরআন সকল রক্তকে হারাম ঘোষণা করেছে। অথচ দুই প্রকারের রক্ত হালাল, তা হ’ল কলিজা ও যকৃত। কিন্তু এগুলির কোনও বর্ণনা কুরআনে নেই, বরং শুধু হাদীছ থেকেই আমরা পেয়ে থাকি। যেমন রাসূল কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনঃ

أُحِلَّتْ لَنَا مَيْتَتَانِ وَدَمَانِ فَأَمَّا الْمَيْتَتَانِ فَالْحُوْتُ وَالْجَرَادُ ، وَأَمَّا الدَّمَانِ فَالْكَبِدُ وَالطِّحَالُ.

‘আমাদের জন্য দুই মৃতপ্রাণী ও দুই রক্ত হালাল। দুই মৃত প্রাণী হ’ল। মাছ এবং টিড্ডি, আর দুই রক্তের অর্থ হ’ল কলিজা ও যকৃত’।

(চ) পুরুষের জন্য স্বর্ণ ও রেশমের কাপড় ব্যবহার যে হারাম তাও আমরা কুরআনে পাইনি, বরং হাদীছ থেকেই পেয়েছি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাতে স্বর্ণ ও অন্য হাতে রেশমের কাপড় নিয়ে উভয় হাত উপরে উঠিয়ে বললেনঃ

إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُوْرِ أُمَّتِى حِلٌّ لِأِنَاثِهِمْ

‘এ বস্তুদ্বয় আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম, মহিলাদের জন্য হালাল’।

(ছ) গৃহ পালিত গাধা ও ছেদন দাঁতওয়ালা হিংস্র পশুর গোস্ত হারাম হওয়ার বিধানটিও শুধু হাদীছ থেকেই জানা যায়। কুরআন মজীদে এব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

أَلَا لَايَحِلُّ لَكُمْ لَحْمُ الْحِمَارِ الْأَهْلِىِّ وَلَا كُلُّ ذِيْ نَابٍ مِنَ السَّبُعِ

‘জেনে রেখ, গৃহ পালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয়, এবং ছেদন দাঁত ওয়ালা কোন হিংস্র পশুও হালাল নয়’।

(জ) এমনিভাবে ঈদের ছালাত, চন্দ্রগ্রহনের ছালাত, সুর্যগ্রহনের ছালাত, প্রত্যেক নেশাযুক্ত দ্রব্য হারাম হওয়া, কেয়ামতের পূর্বে ঈসা (আঃ) এর আসমান থেকে অবতরণ, ইমাম মাহদীর আবির্ভাব, দাজ্জালের আগমন, কবরের আযাব, ঋতুবতী মহিলার জন্য নামায ও রোযা নিষিদ্ধ হওয়া, বিবাহিত ও অবিবাহিত যিনাকারের শাস্তির ভিন্নতা, খতনার বিধান, স্ত্রীর সাথে তার খালা-ফুফুকে বিবাহ করা হারাম হওয়া, আমীরের আনুগত্য করা ইত্যাদি আরো অনেক অনেক বিধান শুধু হাদীছ থেকেই আমরা জানতে পারি, কুরআন থেকে নয়। সুতরাং মুসলিমদের জন্য হাদীছের প্রয়োজনীয়তা কত যে বেশী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

আরও দেখুন:  হাদীছ কি এবং কেনো? - ১

৪. সঠিকভাবে কুরআন বুঝা হাদীছের উপর নির্ভরশীল ঃ

কুরআন মজীদের সঠিক মর্ম ও উদ্দেশ্য জানার জন্য অথবা শুদ্ধভাবে তার অর্থ ও তাফসীর বুঝার জন্য শুধু আরবী ভাষা জ্ঞান ও সাহিত্যে পারদর্শীতা যথেষ্ট নয়। বরং এর জন্য চাই, অনেক আরবী জ্ঞানে পারদর্শীতা। কুরআন বিজ্ঞানের মহাজ্ঞানী আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ) বলেনঃ ‘সঠিকভাবে কুরআন মজীদের অর্থ ও তাফসীর বুঝার জন্য পনের রকমের জ্ঞানে পারদর্শী হতে হয়। যথা, আরবী ভাষা, ব্যাকরণ, ইলমে ছারফ, ইলমে ইশতিক্কাক্ক, মাঅ’ানী, বয়ান, বদীই, ইলমে কেরাঅ’াত, উসূলেদ্বীন, উসূলে ফিকহ, আস্বাবে নুযুল, ঘটনাবলী, নাসেখ-মনসূখ, ইলমে ফিকহ, হাদীছ এবং ইলমে লাদুন্নী। এসকল জ্ঞান হ’ল তাফসীরে কুরআনের জন্য মাধ্যম। উক্ত জ্ঞানগুলিতে গভীর পারদর্শীতা অর্জন ব্যতীত কেউ কুরআনের তাফসীর করলে তা হবে ‘তাফসীর বির রায়’ অর্থাৎ মনগড়া তাফসীর ও ব্যাখ্যা যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ’।

ইমাম ইবনু কাছীর বলেনঃ ‘মনগড়া তাফসীর করা হারাম’।

আসল কথা হ’ল সব জ্ঞান থাকলেও যদি হাদীছের জ্ঞান না থাকে অথবা হাদীছকে বাদ দেয়া হয়, তা হ’লে কুরআন বুঝা সম্ভব হবেনা। এব্যাপারে কতিপয় দৃষ্টান্ত পেশ করছিঃ-

(ক) আল্লাহ তাআ’লা ইরশাদ করেনঃ

الَّذِينَ آمَنُواْ وَلَمْ يَلْبِسُواْ إِيمَانَهُم بِظُلْمٍ أُوْلَـئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُونَ . (الأنعام : ৮২)

‘যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় ঈমানকে ‘যুলুম’ এর সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী’।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন এ আয়াত নাযিল হয় তখন ছাহাবীগণ একে ভারী মনে করলেন এবং আরয করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে পাপের মাধ্যমে নিজের উপর কোন ‘যুলুম’ করেনি? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেনঃ তোমরা আয়াতের প্রকৃত অর্থ বুঝতে সক্ষম হওনি। আয়াতে ‘যুলুম’ বলে শিরককে বুঝানো হয়েছে। দেখ অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআ’লা বলেছেনঃ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ . ( لقمان : ১৩)

‘নিশ্চয় শিরক বিরাট যুলুম’। কাজেই আয়াতের অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি বিশ্বাস স্থাপন করে, অতঃপর আল্লাহর সত্ত্বা, নাম ও গুণাবলীতে এবং ইবাদতের বেলায় কাউকে অংশীদার করে না, সে শাস্তির কবল থেকে নিরাপদ ও সুপথপ্রাপ্ত।

(খ) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ لَيْسَ أَحَدٌ يُحَاسَبُ إِلَّا هَلَكَ কেয়ামতের দিন যে ব্যক্তিরই হিসাব নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আয়েশা বলেনঃ একথা শুনে আমি বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ কি বলেননি, فَأَمَّا مَنْ أُوْتِيَ كِتَابُهُ بِيَمِيْنِهِ فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيْرًا ‘যাকে ডান হাতে আমলনামা দেয়া হবে তার হিসাব খুব সহজ করে নেয়া হবে’? উত্তরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ذَلِكَ الْعَرْضُ ، يُعْرَضُوْنَ ، وَمَنْ نُوْقِشَ الْحِسَابَ هَلَكَ আমলনামা পেশ করার কথা-যা এভাবে পেশ করা হবে। কিন্তু পরখ করে যার হিসাব-নিকাশ নেয়া হবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।

(গ) আল্লাহ তাঅ’ালা বলেনঃ

وَكُلُواْ وَاشْرَبُواْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ. (البقرة : ১৮৭)

‘তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না (রাতের) কালো রেখার পরে ভোরের সাদা রেখা স্পষ্ট দেখা যায়।’

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর আদী ইবনু হাতেম (রাঃ) একটি কাল সুতা ও একটি সাদা সুতা নিয়ে বালিশের নীচে রাখলেন। রাত অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে তিনি সে দুটোকে বার বার দেখতে লাগলেন। কিন্ত কাল সাদার পাথর্র্ক্য ধরা পড়লনা। সকাল হলে তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি কাল ও সাদা দুটি সুতা আমার বালিশের নীচে রেখেছিলাম। (তারপর সব ঘটনা বললেন) রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাহ’লে তোমার বালিশ খুবই বড় দেখছি। কারণ রাতের কালপ্রান্ত রেখা ও ভোরের সাদাপ্রান্ত রেখার জন্য তোমার বালিশের নীচে স্থান সংকুলান হয়েছে। অতঃপর বললেনঃ এ দুটি সুতা নয় বরং রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলো’।

(ঘ) আল্লাহ তাঅ’ালা বলেনঃ

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَ يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ. (التوبة: ৩৪)

‘আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।’

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর ছাহাবায়ে কেরাম মনে করলেন কোন মাল সম্পদ জমা রাখা যাবেনা, তখন নবী কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃإِذَا أَدَّيْتَ زَكَاةَ مَالِكَ فَقَدْ أَذْهَبْتَ عَنْكَ شَرَّهُ . ‘যদি তুমি তোমার মালের যাকাত আদায় কর তাহলে নিজ থেকে তার ক্ষতিকে তুমি দুর করে দিলে।’ খালেদ ইবনু আসলাম বর্ণনা করেন, একদা আমরা আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) এর সঙ্গে বের হয়েছিলাম তখন তিনি বললেনঃ

هَذَا قَبْلَ أَنْ تُنْزَلَ الزَّكَاةُ فَلَمَّا نَزَلَتْ جَعَلَهَا الله طُهْرًا لِلْأَمْوَالِ .

‘এটি হল যাকাত ফরয হওয়ার আয়াত নাযিল হওয়ার আগের কথা। পরে যখন আল্লাহ তাআ’লা যাকাত ফরয ঘোষণা করে আয়াত নাযিল করেন, তখন তিনি যাকাতকে ধন-মালের পরিশুদ্ধকারী করে দিয়েছেন’। আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রাঃ) বলেনঃ

كُلُّ مَالٍ أَدَّيْتَ زَكَاتَهُ وَإِنْ كَانَ تَحْتَ سَبْعِ أَرْضِيْنَ فَلَيْسَ بِكَنْزٍ وَكُلُّ مَالٍ لَا تُوَدِّى زَكَاتَهُ فَهُوَ كَنْزٌ وَإِنْ كَانَ ظَاهِرًا عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ .

‘যে মালের যাকাত আদায় করা হয়, তা যদি যমীনের সাত স্তর নীচেও থাকে, তাহ’লেও ’কানজ’ তথা সঞ্চিত ধন-রতেœর শামিল নয়। আর যে মালের যাকাত আদায় করা হয় না, তা যদি যমীনের পিঠে খোলা থাকলেও ‘কানজ’ তথা সঞ্চিত ধন-রতেœর শামিল’।

এত্থেকে বুঝা গেল, যাকাত আদায়ের পর যা অবশিষ্ট থাকে তা জমা রাখা গোনাহ নয়।

(ঙ) আল্লাহ তাঅ’ালা বলেনঃ

وَلَقَدْ آتَيْنَاكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنَ الْعَظِيمَ . ( الحجر:৮৭)

‘আমি আপনাকে ‘সাবয়ে মাছানী’ এবং মহান কুরআন দিয়েছি’।

এই আয়াতে ‘সাবয়ে মাছানী’ অর্থ যে সূরা ফাতেহা, তা আমরা একমাত্র হাদীছ থেকেই জানতে পারি। এমনিভাবে কুরআন মজীদের আরো অনেক আয়াত ও শব্দের অর্থ শুধুমাত্র হাদীছ থেকেই জানা যায়। হাদীছ ব্যতীত তা জানার অন্য কোন উপায় নেই।

আরও দেখুন:  সংশয়-সন্দেহে সুন্নাত

৫. হাদীছ ব্যতীত কুরআনী বিধান বাস্তবায়ন অসম্ভব ঃ

যদিও কুরআন মজীদে শরীয়তের মৌলিক বিধানাবলীর বর্ণনা আছে। কিন্তু তা এত সংক্ষিপ্ত যে, শুধু কুরআনের উপর ভিত্তি করে সেগুলির বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। এরূপ অনেক বিধি-বিধান রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ দু’একটি উল্লেখ করছিঃ

(ক) ‘ছালাত’ তথা নামায সম্পর্কে কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ وَأَقِيمُواْ الصَّلاَةَ .তোমরা ছালাত কায়েম কর’। কিন্তু ছালাতের ওয়াক্তসমুহ রাকাতের সংখ্যা, কেরাআতের তাফসীল, শর্ত-শরায়েত, ছালাত ভঙ্গের কারণসমূহ এবং ছালাতের সঠিক নিয়ম-পদ্ধতি ইত্যাদির বিস্তারিত বর্ণনা শুধুমাত্র হাদীছেই আছে।

(খ) কুরআন মজীদে যাকাতের ব্যাপারে বলা হয়েছেঃ وَآتُواْ الزَّكَاةَ ‘তোমরা যাকাত আদায় কর’। কিন্তু যাকাত কি? তার নেছাব কত? কখন তা আদায় করা আবশ্যক? কতটুকু আদায় করা জরুরী? ইত্যাদি শুধু হাদীছ থেকেই আমরা জানি। হাদীছ ব্যতীত এসব কিছু জানার কোন উপায় নেই।

(গ) কুরআন মজীদে সিয়াম (রোযা) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ. (البقرة: ১৮৩)

‘হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগার হতে পার’। কিন্তু সিয়াম ফরয হওয়ার জন্য শর্তশরায়েত কি? সিয়াম ভঙ্গের কারণসমূহ কি? সিয়ামাবস্থায় কি কি বৈধ? ইত্যাদি আরো অনেক বিধি-বিধানের বিস্তারিত বর্ণনা শুধু মাত্র হাদীছ থেকেই পাওয়া যায়।

(ঘ) কুরআন মজীদে হজ্জ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ.

‘আর এঘরের হজ্জ করা হ’ল মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য, যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার’। কিন্তু জীবনে হজ্জ কত বার ফরয? হজ্জের রুকুন কি? হজ্জ আদায়ের সঠিক নিয়ম কি? ইত্যাদি হজ্জ ও উমরা সম্পর্কীয় আরো অনেক বিধানের বিস্তারিত বর্ণনা শুধু হাদীছেই রয়েছে।

(ঙ) পানাহারের বস্তু সামগ্রীর কিছুকে হালাল ও অন্য কিছুকে হারাম ঘোষণা করে বাকী বস্তুত্তসমূহের ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছেঃ

‘তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে’। অন্য স্থানে আছে ‘অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করা হয়েছে’। কিন্তু কোন বস্তু হালাল ও পবিত্র, আর কোনটি অপবিত্র ও হারাম, এ সবের বিস্তারিত বর্ণনা আমরা শুধু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কাজ থেকেই জানতে পেরেছি।

(চ) কুরআন মজীদে চুরি করার শাস্তি বলা হয়েছে ‘হাত কেটে ফেলা। কিন্তু কি পরিমাণ মাল চুরি করলে? এবং কতটুকু হাত কাটবে? ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা শুধু হাদীছেই আমরা পেয়ে থাকি।

(ছ) কুরআন মজীদে মদপান হারাম বলা হয়েছে। কিন্তু সকল মাদক দ্রব্যের বিধান কি হবে? নেশাযুক্ত বস্তু পরিমাণে কমবেশী হলে কি বিধান হবে? ইত্যাদি মদ সংক্রান্ত অনেক বিধানের বিস্তারিত বর্ণনা শুধু হাদীছে পাওয়া যায়।

(জ) কুরআন মজীদে মহিলাদের মীরাস সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, একজন হলে সে অর্ধেক সম্পত্তি পাবে, আর যদি দ’ুয়ের অধিক হয়, তখন দুই তৃতীয়াংশ পাবে। কিন্তু দুইজন হলে কতটুকু পাবে তা আর কুরআনে নেই, তা শুধু হাদীছেই পাওয়া যায়। এছাড়া মীরাস সম্পর্কীয় আরো অনেক বিধান আমরা শুধু হাদীছ থেকেই নিই।

(ঝ) কুরআন মজীদে সূদের ব্যাপারে কড়া তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে যে, এটি হারাম এথেকে দুরে থাক। কিন্তু কোন ধরণের লেনদেন সুদের অন্তর্ভুক্ত আর কোনটি নয়? এসব ব্যাপারে হাদীছেই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

এমনিভাবে শরীয়তের আরো অনেক বিধি-বিধান রয়েছে যেগুলি সম্পর্কে কুরআন মজীদে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হয়েছে। অথচ হাদীছেই পাওয়া যায় তার বিস্তারিত বিবরণ। এমতাবস্থায় যে বা যারাই হাদীছকে বাদ দিয়ে কুরআন বুঝার বা কুরআনী বিধানাবলী বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে, তারা যে স্পষ্ট গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট, তা বলার অপেক্ষ রাখেনা।

আরও দেখুন:  সুন্নাহ উপেক্ষার পরিণাম

এ সম্পর্কিত আরও পোস্ট

মন্তব্য করুন

আরিও দেখুন
Close
Back to top button