জীবন দর্শন

নিঃশ্বাসের কৈফিয়ত

হে মানুষ! তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের মালিক কে? তুমি কি জান কিভাবে তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের আগমন-নির্গমন হয়? কে সেটি নিয়ন্ত্রণ করেন? তুমি কি জানো তোমার নিঃশ্বাসটুকুর মূল্য কত? ওটা বন্ধ হয়ে গেলেই তুমি মৃত লাশে পরিণত হবে। তুমি সবই জানো। আবার কিছুই জানো না। পাগলের মত দৌড়াচ্ছ দুনিয়া লাভের আশায়। অথচ সেটি মরীচিকা মাত্র। যা তোমার ভাগ্যে নির্ধারিত আছে, তা তোমার জন্য আসবেই। তুমি কেবল দেখবে, যার জন্য দৌড়াচ্ছ, সেটি আল্লাহর বিধানে বৈধ, না অবৈধ। যদি বৈধ হয়, তাহ’লে বৈধভাবে চেষ্টা কর। মধ্যমপন্থায় কর, চরমপন্থায় নয়। পেলে আল্লাহর প্রশংসা কর এবং তাঁর ও তাঁর পথে সাহায্যকারী বান্দার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। আর না পেলে দিশেহারা হয়ো না। ধৈর্য ধারণ কর ও এটাকেই আল্লাহর পূর্ব নির্ধারণ বা ভাগ্য বলে ধরে নাও। আল্লাহর অননুমোদিত পথে চেষ্টাকারীদের মন্দফল সম্পর্কে আল্লাহ কি বলেন শুনে রাখ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা অবিশ্বাসী, তাদের কর্মসমূহ মরুভূমির বুকে মরীচিকা সদৃশ। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে। অবশেষে যখন সে তার নিকটে আসে, তখন সেখানে কিছুই পায় না। কেবল আল্লাহকে পায়। অতঃপর আল্লাহ তার পূর্ণ কর্মফল দিয়ে দেন (অর্থাৎ জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন)। বস্ত্ততঃ আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’ (নূর ২৪/৩৯)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের বুঝ দান করেন’ (বুখারী হা/৭১)। অতএব দ্বীন বিরোধী কোন জ্ঞানে ও কর্মে মানবতার কোন কল্যাণ নেই।

শয়তানের কুহকে পড়ে মানুষ ছুটছে তার পিছনে দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে। অথচ আল্লাহ মূলতঃ মানুষের জ্ঞানেরই পরীক্ষা নিবেন ক্বিয়ামতের দিন। সেদিন শিশু বা পাগলের কোন পরীক্ষা হবে না। অতএব হে জ্ঞানীগণ! আপনাকে যিনি জ্ঞান সম্পদ দান করেছেন, তার কাছে এই সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে জওয়াবদিহি করার জন্য প্রস্ত্তত হৌন! চোখে ছানি পড়লে যেমন মানুষ চোখ থাকতেও অন্ধ হয়, নিজের মধ্যে জ্ঞান সম্পদ থাকলেও মানুষ দুনিয়াবী স্বার্থে অন্ধ হয়ে যায়। অতএব জ্ঞানের চক্ষু পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে জ্ঞানদাতা আল্লাহর বিধান সমূহ জানতে হবে। তাঁর প্রেরিত নিষ্পাপ রাসূলের জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। দেখবেন জ্ঞান চক্ষুর ছানি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নইলে এক অন্ধ আরেক অন্ধের কাছে চোখের চিকিৎসা নিতে পারেন না। মনে রাখবেন, বিশুদ্ধ জ্ঞান কখনো বিশুদ্ধ হাদীছের প্রতিকূলে নয়। তাই আপনার জ্ঞান যদি অহি-র জ্ঞানের বিপরীত হয়, তাহ’লে নিজের জ্ঞানকে অহি-র জ্ঞানের কাছে সারেন্ডার করে দিন ও সেটাকে সাদরে বরণ করুন। এতেই আপনার জন্য মঙ্গল রয়েছে ইহজীবনে ও পরজীবনে।

আপনি কি জানেন কতদিনের আয়ুষ্কাল নিয়ে আপনি পৃথিবীতে এসেছেন? আপনি কি জানেন, আলোর গতির হিসাবে প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার বেগে আপনি আপনার চূড়ান্ত মেয়াদের দিকে এগিয়ে চলেছেন? অধিক পাওয়ার লোভে বুঁদ হয়ে আপনি ছুটে চলেছেন কবরস্থানের দিকে। কিন্তু সেখানে কি নিয়ে যাচ্ছেন? তার জন্য কি কি পাথেয় সঞ্চয় করেছেন? আপনি নিজেকে ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পণকারী বলে দাবী করেন। অথচ আপনার ধর্মীয় জীবন ও বৈষয়িক জীবন চলছে পৃথক পৃথক রব-এর অধীনে। আপনি কবরস্থ ব্যক্তির নিকট যাচ্ছেন মাইয়েতের অসীলা ধরার জন্য তার করুণার ভিখারী হয়ে। আপনি মসজিদে যাচ্ছেন ও কা‘বাগৃহ যেয়ারতে যাচ্ছেন আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায়। আবার নিজেদের মনগড়া বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল, সময় ও শ্রম ব্যয় করছেন উন্মাদের মত। তাহ’লে আপনার জীবনের লক্ষ্যপথ কোনটি? নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন। বহুমুখী পথের দিশাহীন গাড়ী অবশ্যই খাদে পড়বে। অতএব জীবনকে স্রেফ আল্লাহমুখী করুন। তিনিই আপনাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। কেননা তাঁর উপরে নির্ভরশীল ব্যক্তি কখনোই বঞ্চিত হয় না। কখনোই নৈরাশ্যের আঁধারে হাবুডুবু খায় না। নিজের জ্ঞানকে যিনি চূড়ান্ত ভাবেন, তিনি যেকোন সময় পদস্খলিত হবেন। যদি না তার সামনে অসীম জ্ঞানের হেদায়াত মওজূদ থাকে। ঠিক যেমন অথৈ সাগরে জাহাযের নাবিক ও নিঃসীম নীলিমায় তীব্র বেগে ধাবমান রকেট-উড়োজাহাযের ক্যাপ্টেন আল্লাহ সৃষ্ট ধ্রুবতারাকে উত্তরে রেখে স্ব স্ব গন্তব্যে ছুটে চলে। জ্ঞানী মানুষ তেমনি জীবনের বাঁকে বাঁকে আল্লাহ প্রেরিত অহি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী পথ চলবে। নইলে সে পথভ্রষ্ট হবেই। যেমনটি হয়েছেন বর্তমানে তাবৎ বিশ্বনেতারা। যাদের কাছ থেকে মানুষ পেয়েছে কেবলি হতাশা ও নৈরাশ্য।

কারু আয়ু বৃদ্ধি তার জন্য পরীক্ষা মাত্র। এক সময় হঠাৎ তাকে বিদায় নিতে হবে ইহজগত থেকে। তার আত্মার সঙ্গে চলে যাবে তার সারা জীবনের কর্ম সমূহের রেকর্ড। যার ফলাফল তাকে পেতেই হবে পরকালে। ঠিক যেভাবে দুনিয়াতে ভেজাল খাদ্য-পানীয় ও দূষিত বায়ু সেবনের ফলাফল সে সঙ্গে সঙ্গে পায় বদ হযম ও নানা রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে। দুনিয়াতে রোগ সারলে সুস্থ হওয়া যায়। কিন্তু নিঃশ্বাস চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। নিজেকে সংশোধনের সুযোগ আর থাকে না। তখন হাযারো ফাতেহাখানী ও কুলখানীতে কোন কাজ হবে না। নিঃশ্বাসের যিনি মালিক, তার কাছে প্রতিটি নিঃশ্বাসের কৈফিয়ত দিতে হবে। সেখানে ব্যর্থ হ’লে জাহান্নামে দগ্ধীভূত হ’তে হবে। সফল হ’লে জান্নাতের সুখ-সম্ভার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

হে রঙিন আশার বংশীবাদক! মানুষের দাসত্ব বরণের জন্য বা মানুষের উপর প্রভুত্ব করার জন্য ছুটে চলো না। মনে রেখ, তোমার কোন উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা কারু নেই আল্লাহর হুকুম ব্যতীত। অতএব মানুষের টাকা বেড়েছে কত, সেটা নয়; বরং মানুষের সুখ বেড়েছে কতটুক, সেটাই দেখ। সর্বাবস্থায় শয়তানের দাসত্ব বর্জন কর। নিজের জীবনে ও সমাজের সর্বত্র আল্লাহর দাসত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা কর। প্রতিটি নিঃশ্বাসকে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে ব্যয় কর। তাহ’লে পরকালের স্থায়ী জীবনে তুমি চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সর্বাবস্থায় তাঁর দাসত্ব করার তাওফীক দান করুন- আমীন!

– Dr. Muhammad Ashadullah Al-Ghalib


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মন্তব্য করুন

আরও দেখুন
Close
Back to top button