সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

তালেবানদের পুনরুত্থান ও আমাদের প্রত্যাশা

‘তালেবান’ অর্থ ছাত্র সংগঠন। যারা ইতিপূর্বে সোভিয়েট দখলদারদের হটানোর জন্য রাস্তায় নেমেছিল ও তাতে সফল হয়েছিল। অতঃপর তারা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত পাঁচ বছর আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় ছিল। আমেরিকা তাদেরকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু তালেবান বাগে না ফেরায় তারা তাদেরকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নিল। অতঃপর সেখানে হামলার অজুহাত সৃষ্টির জন্য ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার ধ্বংসের নাটক মঞ্চস্থ করা হ’ল। ৩ হাযার লোক মারা গেল। কোনরূপ দ্বিধা না করে পরদিন এই ঘটনার জন্য ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে প্রেসিডেন্ট বুশ বিবৃতি দিলেন। অতঃপর ২৮ দিনের মাথায় ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর আফগানিস্তানে আমেরিকা ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান হামলা চালাল। তালেবান কোনরূপ প্রতিরোধ না গড়ে কাবুল ছেড়ে চলে গেল যুদ্ধ কৌশল হিসাবে। ফলে টুইন টাওয়ার পুনর্গঠনে মাত্র ৪০ কোটি ডলারের বিনিময়ে আমেরিকা পেয়ে গেল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ আফগানিস্তান ও পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ২০শে মার্চ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈলভান্ডার ইরাকে হামলার একটি মহা অজুহাত। এখন তারা তেল লুট করছে সিরিয়ায়। সেদিন তালেবান কোনরূপ রক্তপাত না ঘটিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ২০ বছর পর তারাই আবার গত ১৫ই আগস্ট রবিবার বিনা রক্তপাতে রাজধানী কাবুল দখলে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশব স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখেছে তাদের দ্রুতগতির অবিশ্বাস্য বিজয়। কোন কিছুতে তারা হিসাব মিলাতে পারছে না।

দু’দিনের মাথায় ‘তালেবান’ সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। ৩ দিনের মাথায় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব খুলে দিয়েছে। নারীদের হিজাব অপরিহার্য করে দিয়েছে। বলে দিয়েছে ইসলামী বিধান মেনে সবাই স্ব স্ব কাজে যোগ দিবে। ৪ দিনের মাথায় গত ১৯শে আগষ্ট বৃহস্পতিবার তারা ঘোষণা দিয়েছে যে, দেশ চলবে ইসলামী নীতি মোতাবেক তাদের মনোনীত একটি ‘শূরা কাউন্সিলে’র মাধ্যমে। কথিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে আদৌ নয়। আমেরিকার পুতুল প্রেসিডেন্ট আশরাফ গণি ১৪ তারিখেই কাবুল ছেড়ে আরব-আমিরাতে পালিয়েছেন। আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর সহ তার দোসরদের ন্যাক্কারজনকভাবে আমেরিকান বিমানে গাদাগাদি করে সাধারণ লোকদের সাথে পালানোর দৃশ্য দেখে সারা বিশব হাস্যরস করেছে। অথচ তালেবান তাদের থাকতে বলেছিল। কিন্তু নিজেদের সীমাহীন পাপরাশির কারণে তারা এতই ভীত ছিল যে, চারদিকে তারা অন্ধকার দেখেছে। ওসামা বিন লাদেন সহ ৭৮ হাযার তালেবানকে হত্যাকারী আমেরিকানদের প্রতি কোনরূপ প্রতিশোধ না নেওয়ায় সারা বিশব চমকে গেছে। নিহত বিদেশী সৈন্য ও তাদের দেশীয় মুনাফিকদের মৃত্যুতে কোন সান্ত্বনা নেই। যেমনটি প্রবীণ মার্কিন যোদ্ধারা বলেছেন, তারা বিনা কারণেই বিভিন্ন দেশে আত্মত্যাগ করেছেন। ভিয়েতনাম সহ প্রতিটি যুদ্ধের করুণ সমাপ্তি আমেরিকান সৈন্যদের মনে গেঁথে থাকবে’। বারাক ওবামার সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব রবার গেট্স বলেছেন, গত চার দশকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা প্রায় প্রতিটি পররাষ্ট্র ও জাতীয় ইস্যুতে ভুল করেছেন’। তাদের বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, বহির্দেশের যুদ্ধগুলোতে লাখো কোটি ডলার ব্যয় করে আমেরিকা কিছুই পায়নি। কেবল রক্তের দাগই তারা রেখে এসেছে। যা ঐসব দেশের মানুষের কাছে আমেরিকাকে চিরদিনের মত হেয় করেছে।

তালেবান পরিষ্কার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কারু প্রতি হুমকি হবেনা এবং কারু হুমকিকেও তারা পরোয়া করবে না। তারা তাদের দেশকে তাদের মত করে গড়ে তুলবে। ৩ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ১০% শী‘আ সহ ৯৯.৭% মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট এই দেশ ইসলামী বিধান মোতাবেক চলবে। অমুসলিমদের প্রতি ইসলামী সহিষ্ণুতা বজায় থাকবে। নারী শিক্ষা ও তাদের কর্ম উদ্যোগ বাধাহীন থাকবে। তবে সবকিছুই হবে পর্দার সাথে। কোনরূপ বেহায়াপনা বরদাশত করা হবে না। বস্ত্ততঃ এগুলি সবই ধর্মপ্রাণ আফগানদের হৃদয়ের দাবী। আর তাই বিদেশীদের চাপিয়ে দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ধোঁকাবাজি তারা অন্তর থেকে মেনে নেয়নি। কারণ ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’ প্রথমে মানুষকে ইসলামের বন্ধন থেকে মুক্ত করে। অতঃপর ‘গণতন্ত্র’ তাকে মানুষের দাস বানায়। অতঃপর ‘জাতীয়তাবাদ’ তাকে ধর্ম-বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চলে বিভক্ত করে। অতঃপর ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’ এই শয়তানী নীতি তাকে শোষণ ও দাসত্বের শৃঙখলে আবদ্ধ করে। উপরোক্ত তিনটি মতবাদের ছুরি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ ওছমানীয় খেলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছে।

আফগানিস্তানের মানুষ তালেবানদের হৃদয় থেকে গ্রহণ করেছে। আশ্রয় দিয়েছে ও সবরকম সহযোগিতা করেছে। কারণ তারা তাদেরকে ইসলামী খেলাফতের নিশ্চয়তা দিয়েছে। যার অধীনে আল্লাহর বিধান মেনে বসবাস করে তারা জান্নাতের আশা করে। তারা গণতন্ত্রের নামে ঘুষখোর, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজদের আদৌ মেনে নেয়নি। আর সেজন্যেই তো বিনা যুদ্ধে জয় হ’ল তালেবানের। বাংলাদেশের চাইতে পাঁচগুণ বড় ও মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ আফগানিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা করার জন্য শত্রু-মিত্র সবাই ছুটে আসবে। এখন তালেবানের প্রয়োজন হবে কেবল ধৈর্য্য, দৃঢ়তা ও বিচক্ষণতার। যা ইতিমধ্যেই তাদের মধ্যে দেখা গেছে। যদি তারা অলসতা ও বিলাসিতার মোহে না পড়ে, যদি তারা পৃথিবীর এক প্রান্তে তাদের জীবন ও অন্য প্রান্তে জান্নাতকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে চলে; তাহ’লে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই তাদের দমন বা নির্মূল করার। বিশ্বশক্তি নামধারী আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলি বারবার আফগানিস্তানে এসেছে সম্পদ লুট করার জন্য। তারা সেখানকার মানুষের রক্তস্রোত বইয়েছে পানির মত। কিন্তু সর্বদা তাদেরকে ফিরতে হয়েছে ভিক্ষুকের মত কিছু ডলার কুড়িয়ে নিয়ে। এখন তাদের অবস্থা হবে এই যে, তাদের স্বার্থের অনুকূলে হ’লে তালেবানকে তারা বলবে ‘মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী’। আর বিপরীত হ’লে তারা বলবে ‘জঙ্গী’। এইরূপ নোংরা যাদের নীতি, তাদের সঙ্গে কোনরূপ সম্পর্ক না রেখেই তালেবানকে সামনে এগোতে হবে। সাথে সাথে ঘরের শত্রুদের ধৈর্য্যের সাথে মুকাবিলা করতে হবে। এ বিষয়ে কুরআনী বিধান (আলে ইমরান ৩/২৮) ও রাসূল (ছাঃ)-এর কর্মনীতি অনুসরণ করাই যথেষ্ট হবে। মনে রাখতে হবে যে, আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের দু’টি নোংরা পলিসি সর্বদা কার্যকর থাকে। (১) মুসলিম বিশ্বের সম্পদ লুট করা এবং (২) মুসলিম সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলিকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী আন্দোলন বলে বদনাম করা ও তাদেরকে উৎখাত করা। সে হিসাবে তারা বিভিন্ন দেশে সালাফী বা আহলেহাদীছ আন্দোলনকে সর্বদা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে।

অতএব আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন সকল প্রকার মাযহাবী তাক্বলীদ ছেড়ে আহলেসুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের উদার মূলনীতির উপর পরিচালিত হয় এবং কোনরূপ উস্কানী ও প্রতারণার ফাঁদে পা না দিয়ে সর্বদা ইসলামের মধ্যপন্থা নীতি অবলম্বন করে। হানাফী-শাফেঈ দ্বন্দ্বে ও শী‘আ মন্ত্রীর ষড়যন্ত্রে ১২৫৮ খৃষ্টাব্দে বাগদাদের খেলাফত ধ্বংসের ইতিহাস এবং নিকট অতীতে প্রায় ১০০ বছর পূর্বে ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ ওছমানীয় খেলাফত ধ্বংসের ইতিহাস তাদের ভালভাবে জানা আবশ্যক। আন্তর্জাতিক বিশব তাদের নিয়ে নানাভাবে খেলতে চেষ্টা করবে। অতএব সতর্ক থাকা অপরিহার্য। আমরা ‘ইসলামী ইমারত আফগানিস্তান’-এর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সাফল্য কামনা করি।

– প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

(মাসিক আত-তাহরীক)


Discover more from ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

১টি মন্তব্য

  1. এই ব্যাপারে জানার জন্য অনেককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেউ কোনো রেসপন্স করে নি। আজ জানলাম authentic source থেকে।

    আলেমদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এগিয়ে ছিলেন ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার, আছেন ড. গালিব স্যার, এখন – আব্দুল্লাহ ভাই।

মন্তব্য করুন

আরও দেখুন
Close
Back to top button